
নিজস্ব প্রতিনিধি
শ্মশানে রাত কাটানো! কথাটা শুনলেই ভয়ে আঁতকে উঠবেন অনেকে। অথচ সেই শ্মশানেই ৩০ বছর ধরে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করছেন ৭৪ বছর বয়সী মুসলিম জহির শেখ। লাঠি হাতে রাতভর বিশাল আয়তনের শ্মশানের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়ান তিনি। তন্দ্রা এলে বিশ্রাম নেন শ্মশানের কালিমাতা মন্দিরেই।
মুসলিম হয়েও হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠান ও নিয়ম মেনে এবং পবিত্রতা রক্ষা করেই মন্দিরে প্রবেশ করেন জহির শেখ। আবার আজান হলেই নামাজ পড়তে ছুটে যান মসজিদে।
সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার গয়লা মহল্লার বাসিন্দা জহির শেখ। শহরের ঘুরকা মহাশ্মশান ও শ্রী শ্রী কালিমাতা মন্দিরের নৈশপ্রহরীর দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। নিজ ধর্মকে অন্তরে ধারণ করেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শ্মশান ও মন্দিরের সেবায় নিয়োজিত জহির শেখ।
যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী ঘুরকা মহাশ্মশান ও শ্রী শ্রী কালিমাতা মন্দির। প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো জেলার কেন্দ্রীয় এই মহাশ্মশানে শহর ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মরদেহের সৎকার হয়ে আসছে। মহাশ্মশানকে ঘিরে রয়েছে শ্রী শ্রী কালিমাতা মন্দির, শিব মন্দির, লোকনাথ মন্দির, মঠ ও মনসা মন্দির।
দিবানিশি কালীপূজা, শিব চতুর্দশী, শ্রী শ্রী লোকনাথের আবির্ভাব ও তিরোধান দিবসসহ সারা বছরই মন্দিরে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৯৬ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভা থেকে শ্মশানের নৈশপ্রহরী হিসেবে জহির শেখ ও আব্দুল মমিন নামের দুই মুসলিম ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। দুই বছর আগে আব্দুল মমিন মারা যান। এরপর থেকে একাই শ্মশান পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন জহির শেখ। শুধু তাই নয়, শ্মশানে মৃতদেহের সৎকারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করেন তিনি।
জহির শেখ বলেন, ‘আমি নৈশপ্রহরী হলেও রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই এখানেই থাকি। লাশ নিয়ে আসলে ঘর খুলে দিতে হয়। সৎকারে খড়ি বা অন্য কোনো কিছু কম পড়লে তা এনে দিই। পুরোহিত বা অন্যরা অনেক অলৌকিক কিছু এই শ্মশানে দেখেছেন। তবে আমি কখনো কিছু দেখতে পাইনি। আমি কোনো দিন ভয় পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘আমি মুসলিম। গরুর মাংস খেলে গোসল করে পবিত্র হয়ে মন্দিরে প্রবেশ করি। ২৩ বছর আমার কাছে এই মন্দিরের চাবি ছিল। হিন্দুদেরও আমি বলে দিই, তোমরা অপবিত্র অবস্থায় এখানে এসো না। এটা পবিত্র স্থান। এখানে পবিত্র হয়েই যেতে হবে।’
জহির শেখ বলেন, ‘আমি আমার ধর্ম যথাযথভাবে পালন করি। আমি সংসার চালানোর জন্য চাকরি করি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি।’
মাসে মাত্র সাড়ে ৬ হাজার টাকা বেতন পান জহির শেখ। এই বেতনে সংসার চালানো সম্ভব না হওয়ায় তিনি গবাদিপশুও পালন করেন।
পৌরসভা যতদিন দায়িত্বে রাখবে, ততদিনই মন্দিরের দায়িত্বে থাকতে চান জহির শেখ। তিনি বলেন, ‘এখানে থাকতে আমার ভালোই লাগে। হিন্দুরা আমাকে ভালোবাসে, আমিও তাদের ভালোবাসি।’
শ্মশানে মরদেহ সৎকারের দায়িত্বে থাকা স্বপন দাস বলেন, ‘মুসলিম হয়েও সুন্দরভাবে শ্মশানের দেখাশোনা করেন জহির শেখ। লাশ পোড়ানোর জন্য খড়ি সাজানোসহ বিভিন্ন কাজে তিনি সহযোগিতা করেন।’
মন্দির কমিটির সদস্য মন্টু দাস জহির শেখের প্রশংসা করে বলেন, ‘জহির শেখ ও আব্দুল মমিন দীর্ঘদিন ধরে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে মিশে গেছেন।’
মন্দিরের পুরোহিত বলেন, ‘জহির শেখ পবিত্রতা ও ধর্মীয় গাম্ভীর্য বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিজের ধর্মও সঠিকভাবে পালন করেন।’
মন্দির কমিটির সদস্য রাজীব কুমার বলেন, ‘ঘুরকা মহাশ্মশান ও কালিমাতা মন্দির সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এখানে হিন্দুদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মুসলিম ভক্তও আসেন।’