
দৃশ্যপট ডেস্ক রিপোর্ট
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় বোরো ধানের ক্ষেতে হঠাৎ করে নেক ব্লাস্ট (ধানের গলা পচা) রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা। ভালো ফলনের আশায় চাষ করা ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
কৃষকরা জানান, প্রথমে জমির কোনো একটি স্থানে রোগের লক্ষণ দেখা দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা দ্রুত পুরো জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী বারবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে ধানের শীষ সাদা হয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে, যা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেসব জমিতে এখনো নেক ব্লাস্ট দেখা দেয়নি, সেসব জমির মালিকরাও রয়েছেন চরম আতঙ্কে। রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তারা প্রতিরোধমূলক স্প্রে চালিয়ে গেলেও নিশ্চিত হতে পারছেন না ফলাফল নিয়ে।
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের সুপারিশ অনুযায়ী ট্রাইসাইক্লোজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেও কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা এবং কৃষি বিভাগের প্রেসক্রিপশন নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে রায়গঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে প্রায় ৬০ হাজার কৃষক ১৯ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। অনুকূল ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে নেক ব্লাস্ট রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
সোনা খাড়া ইউনিয়নের ধলজান ও গোতিথা গ্রামের কৃষক জহুরুল ও রিপন রায় জানান, কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে এসে লিফলেট বিতরণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সেই অনুযায়ী স্প্রে করার পরও বিশেষ করে আগাম রোপণ করা জমিতে রোগের প্রকোপ বেশি দেখ যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ধামাইনগর এলাকার কৃষক আব্দুল করিম অভিযোগ, তার জমি রাস্তার পাশে হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কৃষি কর্মকর্তা সরেজমিনে পরিদর্শনে আসেননি।
স্থানীয় কৃষক জামাল হোসেন বলেন, “আমি ব্রি মিনিকেট জাতের ধান ১০ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। হঠাৎ দেখি ধানের শীষ সাদা হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় কীটনাশক ব্যবসায়ীর পরামর্শে ওষুধ স্প্রে করি। পরপর দুইবার স্প্রে করার পর কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে।”
বাঁকাই গ্রামের কৃষক মোহাব্বত তালুকদার জানান, তার ৭ বিঘা জমিতে এই রোগ দেখা দিয়েছে। একই গ্রামের জিন্নাহর ৫ বিঘা জমিতেও গলা পচা রোগ দেখা দিয়েছে, কিন্তু বিষ প্রয়োগ করেও তেমন ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
ধামাইনগর ইউনিয়নের উত্তর ফরিদপুর গ্রামের কৃষক আবদুল খাবির বলেন, “৬ বিঘা জমিতে ব্রি-৯০ জাতের ধান চাষ করেছি। আর ১০-১২ দিনের মধ্যে ধান কাটার কথা ছিল। এই সময়েই গলা পচা রোগ ধরেছে। ওষুধ স্প্রে করেও আশানুরূপ ফল পাচ্ছি না।”
একই এলাকার কৃষক সুধাংশু, জসিম ও আশিক মাহাতো অভিযোগ করে বলেন, “ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। বিঘার পর বিঘা জমির ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি।”
ধামাইনগর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহানারা জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। কৃষকদের ট্রুপার, নাটিভো ও সালফাইটারসহ বিভিন্ন ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হয়েছে।
রায়গঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, “চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৯ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের চাষ হয়েছে। রোগ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে, যাতে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।” নিয়ম মেনে স্প্রে করতে হবে।
তিনি আরও জানান, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃষি বিভাগের নির্ধারিত প্রেসক্রিপশনের বাইরে সাধারণ রোগের ওষুধ ব্লাস্ট রোগের নামে বিক্রি করছেন। এতে অনেক কৃষক প্রতারিত হচ্ছেন এবং রোগ দমন ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, ধান কাটতে আর মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন বাকি থাকায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা। ফসল ঘরে তোলার আগমুহূর্তে এমন বিপর্যয়ে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।