
ন্যাশনাল ডেস্ক
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে মাত্র ৩ কিলোমিটার সড়কের অভাবে উপজেলার বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর পশ্চিম তীরের ছয়টি চরাঞ্চলের ১৫ হাজার মানুষকে উপজেলা পরিষদে যেতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার বুকে গড়ে ওঠা চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখাঁ, চর মনম্বর, চর চতুরা, চর গতিয়াসাম ও চর খিতাবখাঁ-এই ছয়টি চরে অন্তত ২০টির বেশি পাড়া রয়েছে। নদীর ভাঙা-গড়ার সঙ্গে বদলে যাওয়া এই জনপদ আজও উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি বাড়লে চরবাসীর একমাত্র ভরসা নৌকা। তবে সেই নৌযানেও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। আবার পানি কমে গেলে নৌকা চলাচলও ব্যাহত হয়। কোথাও চললেও বারবার বালুচরে আটকে পড়ে। ফলে মাত্র আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে তিন ঘণ্টারও বেশি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি একটি টেকসই সড়ক। খিতাবখাঁ এলাকার বাসিন্দা মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল হয়েছে, গ্রামের কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও আমরা একটি রাস্তা, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, সেতু কিংবা ভালো হাসপাতাল পাইনি।’
চর বিদ্যানন্দের শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘একটি সাধারণ কাগজে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর নিতে গেলেও দুই জেলার ভেতর দিয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। চেয়ারম্যান না থাকলে পুরো দিনটাই নষ্ট হয়ে যায়।’
চরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকট যোগাযোগব্যবস্থা। ছোট-বড় মিলিয়ে ১০-১২টি কাঁচা রাস্তা থাকলেও বর্ষায় অধিকাংশই পানিতে তলিয়ে যায়। উঁচু পাকা সড়ক না থাকায় প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্থানীয়দের।
শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থাও নাজুক। পুরো এলাকায় রয়েছে মাত্র দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীভাঙনে একাধিকবার বিদ্যালয় দুটি বিলীন হয়েছে। পুনর্নির্মাণ করা হলেও এখনো ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, বাড়ছে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিও।
বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। অভিভাবক মৌল মিয়া ও জাফর আলী জানান, সন্তানদের স্কুলে যেতে দুই সেট কাপড় বহন করতে হয়। এক কাপড়ে পানি পাড়ি দিয়ে অপর কাপড় পরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও অত্যন্ত নাজুক। প্রায় ৮ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি কমিউনিটি ক্লিনিক- চর বিদ্যানন্দ কমিউনিটি ক্লিনিক। সেটিও মূল চরাঞ্চলের বিপরীত পাশে অবস্থিত। সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন স্বাস্থ্যকর্মী।
স্বাস্থ্যকর্মী রুফাইদা ইয়াসমিন বীমা বলেন, ‘আমি একাই এখানে দায়িত্ব পালন করছি। প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন রোগী আসে। কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ ও জনবল না থাকায় সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’
জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিস চরাঞ্চলে পৌঁছাতে পারে না। নেই নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও। ফলে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে স্থানীয় কবিরাজের শরণাপন্ন হন।
অন্যদিকে কৃষিতে রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। চরাঞ্চলের উর্বর জমিতে বাদাম, আলু, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় কৃষকরা সহজে বাজারে পণ্য নিতে পারেন না। ফলে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
কৃষক নুরুল হক মুন্সি বলেন, ‘আমাদের রিলিফ দরকার নেই। একটা রাস্তা করে দিলেই আমরা নিজেরা ফসল বিক্রি করে ভালোভাবে বাঁচতে পারব।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের দেখা মেলে না। চর বিদ্যানন্দের আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এলাকায় রাস্তাঘাট কিছুই নেই। ইউনিয়ন পরিষদে যেতে ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়।’
একই অভিযোগ হায়দার আলীর। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সবাই আসে, ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেয় না।’
বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তাইজুল ইসলাম বলেন, ‘চরবাসীদের ইউনিয়ন পরিষদে আসতে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তাদের যাতায়াত ব্যবস্থা অনেক সহজ হবে।’
তিস্তার বুকে গড়ে ওঠা এই জনপদের মানুষের দাবি একটাই, মাত্র ৩ কিলোমিটার টেকসই সড়ক নির্মাণ। তাদের বিশ্বাস, এই সড়ক নির্মিত হলে বদলে যাবে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের জীবন, সহজ হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, পাশাপাশি কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণও হবে নির্বিঘ্ন। উন্নয়নের বৈষম্য দূর করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা।