
শাকিল হোসেন, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র চন্দ্রা ত্রিমোড়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অনলাইন বাস টিকিটের নামে সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের প্রতারণা দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিন অর্ধলক্ষাধিক মানুষের যাতায়াতের এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি চক্র খোলা আকাশের নিচে বসেই যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কালিয়াকৈর সরকারি কলেজ গেটসংলগ্ন ফুটপাত ও আশপাশের চায়ের দোকানের সামনে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিত অবস্থান নেয়। তাদের কোনো বৈধ কাউন্টার বা লাইসেন্স নেই। কেবল মুখের আশ্বাস ও ভুয়া মোবাইল মেসেজ দেখিয়ে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গগামী যাত্রীদের কাছে কম মূল্যে বা দ্রুত টিকিট দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, টাকা নেওয়ার কিছু সময় পরই দালালরা সেখান থেকে সরে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর যাত্রীরা বুঝতে পারেন, তাদের হাতে দেওয়া টিকিট ভুয়া।
কুড়িগ্রামগামী যাত্রী আফরিন বলেন, “৯০০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছিলাম। তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাস পাইনি। পরে জানতে পারি টিকিটটি ভুয়া। টাকা ফেরত চাইলে তারা থানায় যেতে বলে।”
রংপুরগামী শ্রমিক আব্দুল হাকিম বলেন, “৮০০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছিলাম। পরে কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারি, ওই নামে কোনো টিকিটই ইস্যু হয়নি।”
বগুড়াগামী শিক্ষার্থী রাকিব বলেন, “জরুরি টিকিটের কথা বলে ৫০০ টাকা নেয়। পরে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এভাবে আমাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
দিনাজপুরগামী ব্যবসায়ী সেলিমের দাবি, “প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন যাত্রী এভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অথচ কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দালালদের কারণে বৈধ টিকিট কাউন্টারগুলোর সুনাম ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতারণার ভয়ে অনেক যাত্রী এখন চন্দ্রা থেকে টিকিট কিনতে অনাগ্রহী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতারণার স্থান থেকে নাওজোড় থানার দূরত্ব খুব বেশি নয়। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এই প্রতারণা চললেও কার্যকর অভিযান না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
এ বিষয়ে নাওজোড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাফর আলী খান বলেন, “এটি জঘন্য অপরাধ। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই চন্দ্রা ত্রিমোড়ে অভিযান পরিচালনা করে দালালদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা হবে।”
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হুসাইন বলেন, “চন্দ্রা ত্রিমোড় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। এখানে যাত্রী হয়রানি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। প্রতারকদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি স্থায়ী পুলিশ বক্স, সিসিটিভি ক্যামেরা ও বৈধ টিকিট কাউন্টারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাত্রীদেরও অনুরোধ করছি, ফুটপাতে বসা দালালদের কাছে কোনো অর্থ লেনদেন করবেন না।”
এদিকে যাত্রী, পরিবহন মালিক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে দালাল চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার, চন্দ্রা ত্রিমোড়ে স্থায়ী পুলিশ বক্স ও সিসিটিভি স্থাপন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং বৈধ টিকিট কাউন্টারের তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।