
শাহ আলম সরকার, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
ছোটবেলায় বাবা-মা নাম রেখেছিলেন স্বপন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছেন। তবে জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বপন থেকে আজ তিনি স্বপ্না। সমাজের অবহেলা ও নানা কটূক্তি পেছনে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেন ছাগলের খামার। মাত্র দুটি ছাগল দিয়ে শুরু করা সেই খামার এখন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। বর্তমানে খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। ছাগল পালন করেই সংসার চালানোর পাশাপাশি খামারটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন তৃতীয় লিঙ্গের স্বপ্না।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর মিলপাড়া এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করেন স্বপ্না (২৩)। তাঁর বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নুরজাহান বেগম। আর্থিক অনটনের মধ্যেও নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।
স্বপ্না জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে জীবিকার তাগিদে একসময় অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে হতো তাঁকে। এ সময় নানা ধরনের মন্তব্য শুনতে হতো। কেউ কেউ তাঁদের নিয়ে নেতিবাচক কথা বলতেন। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজেই কিছু করবেন। সেই চিন্তা থেকেই ছাগল পালনের উদ্যোগ নেন। প্রথমে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দুটি ছাগল নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন স্বপ্না। তাঁর মা নুরজাহান বেগম জানান, তাঁদের নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই। সরকারি জায়গায় বসবাস করেন তাঁরা। সংসার চালাতেও নানা কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। পাশের বাড়ির একজনকে ছাগল পালন করতে দেখে স্বপ্নারও ছাগল কেনার ইচ্ছা হয়। পরে তাঁর বাবা ১৩ হাজার ও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে দেন। সেই দুটি ছাগল দিয়েই স্বপ্নার খামার শুরু। শুরুতে অল্প কয়েকটি ছাগল নিয়ে পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে ছাগলের সংখ্যা বাড়িয়ে ১২টিতে নিয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়টি ছাগল মারা যায়। পরে আরও ছাগল মারা যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। সব প্রতিকূলতা সামলে আবারও খামার পরিচালনা করছেন স্বপ্না। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। তোতা, হরিয়ানা, বিটল, যমুনাপাড়ি ও ব্ল্যাক বেঙ্গলসহ বিভিন্ন জাতের ছাগল পালন করছেন তিনি। যার প্রতিটি ছাগলের বাজার দাম ১ লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত।
স্বপ্নার ভাষ্য, খামারের ছাগলের পাঠা প্রজনন থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। এ ছাড়া বছর শেষে বিক্রির উপযোগী ছাগল বিক্রি করেও ভালো অর্থ পাওয়া যায়। গত বছর চট্টগ্রামে বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে ১০টি ছাগল বিক্রি করে তিনি মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানান।
স্বপ্না বলেন, “আমি চাই না, জীবিকার জন্য আর কারও কাছে হাত পাততে হোক। এই খামার দিয়েই আমার সংসার চলে। অনেক কষ্ট করে খামারটি দাঁড় করিয়েছি। মাঝেমধ্যে ছাগল মারা যাওয়ায় লোকসানও হয়েছে। তারপরও হাল ছাড়িনি। আমার স্বপ্ন, খামারটিকে আরও বড় করা। সরকার যদি আমাকে সহযোগিতা করে, তাহলে আরও উন্নতভাবে ছাগল পালন করতে পারব এবং স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও উদাহরণ তৈরি করতে পারব।”
সমাজের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্নার এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও জীবিকার পথ তৈরি করা সম্ভব। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারি সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে খামারটি আরও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। তাতে নিজের জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নও পূরণ হবে।