
দৃশ্যপট ডেস্ক রিপোর্ট
রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের ক্ষিরতলা গ্রামের কমলা খা শ্মশানে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী চড়ক মেলা। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই মেলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
মেলাটি আয়োজন করেন কমলা খা শ্মশান কমিটির সদস্যরা। কমিটির সভাপতি নিবাস মাহাতো জানান, “এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের আমল থেকে চলে আসা একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রথা। আমরা প্রতি বছর এই চড়ক পূজা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে থাকি।”
চড়ক মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে এর প্রস্তুতি প্রক্রিয়া। একটি বড় গাছের গুঁড়ি সারা বছর পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। চৈত্র সংক্রান্তির দিন সেটি তুলে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়। গুঁড়ির মাথায় কাঠামো তৈরি করে বাঁশ দিয়ে মইয়ের মতো করে চড়ক নির্মাণ করা হয়।
পূজা-অর্চনার পর একজন সন্ন্যাসীকে নতুন পোশাক পরিয়ে তার পিঠে প্রায় ১২ ইঞ্চি লম্বা বড়শি গেঁথে দড়ির সাহায্যে চড়কের সঙ্গে বেঁধে ঘোরানো হয়। এই দৃশ্য মেলার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করে।
মেলায় আসা এক দর্শনার্থী বলেন,প্রতি বছর মতো এবারও এসেছি চড়ক মেলায় পরিবার নিয়ে।
মেলায় অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসী শ্যামল বলেন, “এতো বড় বড়শি গেঁথে ঘোরা সহজ নয়, এর জন্য সাধনা করতে হয়। সবাই দেখেছেন, কোনো রক্ত বের হয়নি। পূজা শেষে সামান্য ব্যথানাশক ওষুধ নিলেই ঠিক হয়ে যায়। সবই বাবা ভোলানাথের কৃপা।”
চড়ক পূজা বাংলার একটি প্রাচীন লোকায়ত ধর্মীয় উৎসব, যা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পালিত হয়। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিব উপাসনা। চৈত্র মাসের শেষ দিন বা চৈত্র সংক্রান্তিতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলা বছরের শেষ দিন হিসেবে বিবেচিত।
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, গ্রামীণ বাংলায় বহু শতাব্দী ধরে চড়ক পূজা প্রচলিত। এটি মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজে ভালো ফসল, রোগমুক্তি এবং শান্তি কামনায় পালন করা হতো। সন্ন্যাসীদের দেহে বড়শি গেঁথে ঘোরানো বা অন্যান্য কঠোর আচারগুলোকে ভক্তি, ত্যাগ ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
চড়ক মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবছর এই মেলাকে ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা নতুন প্রজন্মের কাছে পুরনো ঐতিহ্যকে জীবন্ত করে তোলে।