
দৃশ্যপট ডেস্ক
যে নদীতে কলকল রবে বইতো স্বচ্ছ জলধারা, দূরন্ত শিশু-কিশোরের দল কাটতো সাঁতার, চলতো ছোট, বড় ও মাঝারি নৌকা। সময়ের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী সেই গাঢ়ুদহ নদীটি সংকুচিত হয়ে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা হাটের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীটি দখল ও দূষণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। বাতাসে স্নিগ্ধতা ছড়ানো গাঢ়ুদহ এখন দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ করছে।
সিরাজগঞ্জ জেলাকে দিখণ্ডিত করে বয়ে চলা ফুলজোড় নদীর ভুইয়াগাঁতী এলাকায় নিখিল চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে থেকে গাঢ়ুদহ নদীটির উৎপত্তি। সেখান থেকে চলবিলের মাঝখান দিয়ে সর্পিল গতিতে প্রবাহিত হয়ে উল্লাপাড়ার লাহিড়ী মোহনপুরে গোহালা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়।
আবার গোহালা নামে শাহজাদপুর উপজেলার বুড়ি পোতাজিয়ায় চলনবিলের বৃহত্তম নদী বড়ালের সঙ্গে মিলিত হয়।
ছালাম সরকার, সোহেল সেখ, রাকিব ও খোদেজা খাতুনসহ এলাকাবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাঢ়ুদহ এক সময় বিশাল স্রোতস্বিনী নদী ছিল।
বড় বড় মালবাহী নৌকা চলতো। বছরে বছরে নৌকাবাইচ হতো। নৌকা দিয়ে এপার-ওপার পারাপার হতো মানুষ। সেই যৌবনাবতী গাঢ়ুদহ নদীটি সলঙ্গা হাটের কাছে এসেই মরা খালে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীরা নদীর পাড় দখল করে দোকানপাট-বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। সেই সঙ্গে হাট-বাজারের যাবতীয় ময়লা আবর্জনা নদীর বুকেই ফেলা হচ্ছে। দখলমুক্ত ও পুনঃখনন না করায় নাব্যতা হারিয়ে জোলায় পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নদীটি।
স্থানীয়রা জানায়, দুই পাড় দখল করতে করতে নদীটি এখন জোলায় পরিণত হয়ে গেছে। আর ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে দুর্গন্ধে এখান দিয়ে মানুষের চলাচল দুস্কর হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সলঙ্গা বাজারের উত্তর-দক্ষিণে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে দোকানপাট ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। শাহজাহান আলী, আকবর আলী মাস্টার, আনোয়ার আমিন, বরুন সাহা, ফকরুল তালুকদার, তোতা তালুকদার, জুয়েল রানা, আজাদ, রবিন, আতাউর রহমান লাবু, ফণী ভূষণ পোদ্দার, হিটু, আলীম মাইক, মৃত মনিরুজ্জামান তারা খোন্দকারসহ অর্ধ শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের অনেকেই নদীর পাড়ে পাইলিং করে একতলা বা দোতলা ভবন নির্মাণ করেছেন।
এদিকে সলঙ্গা হাট ও বাজারের যাবতীয় আবর্জনা ফেলে নদীর পানি ব্যাপকভাবে দূষিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে নদীটিকে।
কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আশিক ইকবালের সঙ্গে। নদীর সঙ্গে বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি নদীতে স্রোত ছিল, এখানে মাছ ধরতাম, গোসল করতাম। বড় বড় নৌকা আসতো। নৌকা থেকে মালামাল হাটে নিয়ে আসতো। এখন কোনো ঘাট নেই, গোসল করার অবস্থা নেই। দখলে দখলে হাটের রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। সলঙ্গা বাজারের বাসিন্দা হিসেবে আমরা সাংঘাতিক পেরেশানির মধ্যে আছি। উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম একই অবস্থা। আমরা চাই গাঢ়ুদহ নদী প্রসারিত হোক, একটি ঘাট থাকবে নৌকা আসবে। আগের মতো স্রোত হবে। আমরা যাতে গোসল করতে পারি সেই অবস্থা ফিরে আসুক।
কলেজছাত্র রাজিবুল হাসান বলেন, সলঙ্গা নদীর ধারে বিল্ডিং করে দখল করে আছে সেগুলো যদি মুক্ত করা যায় আমাদের চলাফেরা সুবিধা হবে। নদীটি রক্ষা হলে এলাকার পরিবেশও সুন্দর হবে।
আব্দুস ছামাদ বলেন, নদীর সাইট দিয়ে বাড়িঘর করে নদী আস্তে আস্তে ভরাট করে ফেলেছে। নদী আর নদী নেই, এখন এটা জোলায় পরিণত হয়েছে।
এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে জাল দলিল তৈরি করে নদীর পাড় দখলে নিয়ে পাকা ও আধা-পাকা ভবন এবং মার্কেট নির্মাণ করেছে প্রভাবশালীরা।
সলঙ্গা থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মারুফ হাসান খোকন বলেন, গাঢ়ুদহ নদীর পারে কোনো এক সময় কাউকে কাউকে লিজ দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। পরবর্তীতে অনেকেই দখলে নিয়েছে। অনেকেই লিজ ছাড়াই নদীর পার দখল করে নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি না দেখে আমরা বলে কোনো কাজ করতে পারবো না। আমরা সলঙ্গাকে দখলদারদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত করতে চাই।
দখলের কথা অস্বীকার করে আনোয়ার আমিনসহ অনেকেই বলেন, আমরা আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তির ওপর ভবন ও ঘর নির্মাণ করেছি। জমির সব বৈধ কাগজ রয়েছে। অনেকেই দাবি করেন, তারা লিজ নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তবে লিজের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক ও ফুলজোড়-করতোয়া নদী রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক দীপক কুমার কর বলেন, গাঢ়ুদহ নদীটির প্রথম সর্বনাশ হয়েছে ষাটের দশকে সলঙ্গা স্লুইচ গেট করে। তখনই নদীটির গতি থেমে যায়। এই সুযোগে সলঙ্গাবাসী বর্জ্য ফেলার ভাগাড় হিসেবে পরিণত করে, আর চলতে থাকে দখলের প্রতিযোগিতা। আমাদের দাবি নদীতে কোনো নিষ্কাশনের পাইপ রাখা যাবে না। সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খনন করে নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এটা যদি করা হয়, সরকার যদি আন্তরিকভাবে এই কাজটা করে সত্যিকার অর্থে আবার নদীমাতৃক দেশের যে প্রাণচাঞ্চল্য, স্নিগ্ধতা ও জীব বৈচিত্র্য ফিরে পাবো।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, আমাদের সরকার প্রতিশ্রুত ২০ হাজার কিলোমিটার ছোট নদী-খাল খননের প্রক্রিয়া রয়েছে। গাঢ়ুদহ নদীটিও খননের পরিকল্পনা রয়েছে। নদীর বেশিরভাগ অংশই ঠিক আছে সলঙ্গা বাজারটুকু দখলমুক্ত করতে হবে।