
মাসুদ রানা.সিরাজগঞ্জ :
শীতের আগমনে ব্যস্ত সময় পার করছে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের কম্বল পল্লীর কারিগররা। গার্মেন্টস থেকে আনা ঝুট কাপড় দিয়ে বাহারি রকমের কম্বল তৈরী করে স্বাবলম্বী হয়েছেন এই এলাকার প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। মানে ভালো আর দামে কম হওয়ায় এখানকার কম্বলের চাহিদা রয়েছে সারাদেশ জুড়ে। যমুনা নদীর ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলা। এই উপজেলার নাম এখন শুধু ভাঙনের জন্য নয়। এখন এটি কম্বল শিল্পের জন্য পরিচিতি লাভ করেছে। এই ছোট জনপথ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩শ কোটি টাকা কম্বল বেঁচাকেনা হয়। পোশাক কারখানার পরিত্যাক্ত টুকরো কাপড় এক সময় ছিলো মূল্যহীন। কিন্তু আজ এই টুকরো কাপড় কাজীপুরের হাজারো মানুষের জীবিকার প্রধান ভরসা। উপজেলার শিমুলদাইড়, শ্যামপুর, ছালাভরা, কুনকুনিয়া, ঢেকুরিয়া ও বেলতৈল সহ আশপাশের প্রায় ৩০ টি গ্রামে চলছে কম্বল তৈরীর কাজ।
শীতের আগমনে এবার বেশ সরগরম সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে কম্বল পল্লী। কম্বলের পাশাপাশি তৈরী হচ্ছে শিশুদের টাউজার, প্যান্ট, জামা ও সোয়েটার সহ নানা শীতবস্ত্র। প্রায় দুই দশক ধরে কম্বল তৈরীতে পরিনত হয়েছে স্থানীয় উদ্যেগে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঝুট আর গজ কাপড় কিনে এনে উপজেলার প্রায় ৩০টি গ্রামে তৈরী হচ্ছে এই কম্বল। বাহারি রকমের কম্বল তৈরী করে স্বাবলম্বী হয়েছেন এই এলাকার হাজার হাজার নারী-পুরুষ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকার কম্বল কেনাবেঁচা হয় এই কম্বল পল্লীতে। স্বল্প সুদে ঋণ সহ ব্যাংকের শাখা স্থাপন করলে এই শিল্পের আরো উন্নয়ন হবে দাবি কম্বল ব্যবসায়ীদের।
যমুনা নদীর ভাঙন কবলিত উপজেলা সিরাজগঞ্জের কাজীপুর। উপজেলার শিমুলদাইড় বাজার এখন বাংলাদেশের কম্বল শিল্প নামে পরিচিত। পোশাক কারখানার পরিত্যক্ত টুকরো কাপড় দিয়ে এখানে তৈরি হচ্ছে হতদরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের শীত নিবারণের কম্বল। এছাড়া বাহারী রকমের কম্বলও তৈরী হচ্ছে কাজীপুরে। প্রায় দুই দশকের বেশী সময় ধরে চলে আসা কম্বল তৈরির কাজটি এ অঞ্চলে এখন শিল্পের খ্যাতি লাভ করেছে। আর এসব কম্বল সারাদেশের হতদরিদ্র মানুষের শীত নিবারণের অন্যতম বস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবছরও শীতের আগমনিতে সরগরম হয়ে উঠেছে কাজীপুরের কম্বল পল্লীর গ্রামগুলো। কাজীপুর উপজেলার শিমুলদাইড়, শ্যামপুর, ছালাভরা, কুনকুনিয়া, ঢেকুরিয়া ও বেলতৈল সহ আশপাশের প্রায় ৩০ টি গ্রামের প্রতিটি ঘরেই চলছে সেলাইয়ের কাজ। স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে গার্মেন্টস এর টুকরো কাপড় মণ হিসেবে ক্রয় করে নিয়ে আসেন। মণপ্রতি দাম পড়ে ৬শ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। পরে টুকরো কাপড়গুলো বাছাই করে কাটিং এর পর কাপড়গুলো গ্রামের নারী-পুরুষের মাধ্যমে মেশিনে সেলাই করে তৈরি হয় কম্বল। এতে স্বাবলম্বী হচ্ছে গ্রামীন নারীরা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে বেকারদের। ছোট্ট পরিসরে শুরু হওয়ার পর দেশব্যাপি জনপ্রিয়তা পাওয়ায় প্রসার ঘটতে থাকে এই কম্বল শিল্পের। প্রতি শীত মৌসুমে কাজীপুর থেকে সারাদেশে প্রায় ৩শ কোটি টাকার কম্বল বিক্রি করা হয়। অথচ ঋণ ও ব্যাংকিং সুবিধা না থাকাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি। পাইকারদের কাছে সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনেও সারাদেশেই বিক্রি হচ্ছে এখানকার কম্বল। বছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত কাজীপুরের কম্বল বেচাকেনা হয়। এখানে পাওয়া যায় ১শ থেকে ৬ হাজার টাকা মুল্যের কম্বলও।
শিমুলদাইড় গ্রামের কম্বল কারিগর মাসুমা বেগম ভোরের আকাশকে বলেন, প্রথমে কম্বল তৈরি করার জন্য কম্বল কারখানা থেকে আমাদের বাড়িতে গার্মেন্টস থেকে ক্রয় করা জুট আমাদের কাছে পৌছে দেয়৷ আর আমরা সেই ছোট ছোট টুকরো কাপড় একসাথে করে সেলাই মেশিনের মাধ্যমে সেলাই করে সেগুলো দিয়ে আমরা কম্বল তৈরি করি এবং আমাদের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতি কম্বল প্রতি ৩০-৪০ টাকা করে দেওয়া হয়৷ আমরা বাড়ির কাজের পাশাপাশি দৈনিক ৮-১০টি কম্বল তৈরি করতে পারি৷
মেসার্স সহীহ ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী শরিফুল ইসলাম ভোরের আকাশকে বলেন, আমরা নারায়নগঞ্জ থেকে কাচামাল এনে কাটিং করে কম্বল তৈরী করি। দেশের প্রায় ৪০টি জেলার ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন কম্বল কিনতে। দাম কম এবং কম্বলের মান ভালো হওয়ায় এর চাহিদা রয়েছে। এই শিল্পটিকে আরো প্রসার ঘঁটানো সম্ভব। এই জন্য এখানে একটি ব্যাংক স্থাপন করা প্রয়োজন। এই ব্যাংক থেকে ব্যাসায়ীরা অল্প সুদে ঋন নিতে পারবো। যমুনা নদী ভাঙন কবলিত এই এলাকার মানুষ টিকে আছে কম্বল শিল্পের উপর। তাই সরকাররের কাছে ব্যবসায়ীদেও পক্ষ থেকে দাবী থাকবে সল্প সুদ ঋনের ব্যবস্থা করা।
কম্বল ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান ভোরের আকাশকে বলেন, আমরা প্রথমত শুধু মাত্র জুট কাপড় দিয়ে কম্বল তৈরি করতাম৷ এখন তার পাশাপাশি আমরা ফ্রেশ কম্বল ও তৈরি করি৷ আমাদের কাছে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কম্বল পাওয়া যায়৷ আর এখন শুধুমাত্র নিজ জেলাতেই নয় বরং দেশের বেশ কিছু জেলায় এই কম্বল রপ্তানি করে থাকি৷ উত্তরবঙ্গে যেহেতু শীত তুলনামূলক একটু বেশি তার জন্য আমাদের তৈরিকৃত অধিকাংশই উত্তরবঙ্গের জেলা গুলোতেই বিক্রি হয়ে থাকে৷
ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন ভোরের আকাশকে বলেন, নদীতে বাড়ি ঘর হারাইছি। পরে কি করবো চিন্তা করে ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ থেকে টুকরা কাপড় সংগ্রহ করে কাজীপুরে নিয়ে আসি। তার পর মেশিনে সেলাই করে কম্বল তৈরী করি। প্রতিটি কম্বল ৪-৫ হাত হয়ে থাকে। প্রতিটি কম্বল ২৫০-৬০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য হয়ে থাকে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু ভোরের আকাশকে বলেন, সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে প্রতি বছর প্রায় ৩শ কোটি টাকার কম্বল বিক্রি হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এখানে নিরাপত্তা ও ব্যাংকিং সহযোগিতার অভাব আছে। আমি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেছি। এখানে একটি ব্যাংক স্থাপন করা দরকার। যদি স্বল্প সুদে কম্বল ব্যবসায়ীদের ঋন দেওয়া যায় তাহলে এই কম্বল শিল্পটি আরো উন্নত হবে এবং প্রসার ঘটবে। এখানে হাজার হাজার নারী পুরুষের কর্মসংস্থান হবে। এজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।