
শরীফুল আলম,ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধিঃ
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে প্রায় দুই বছর ধরে ইলিয়াস উদ্দিন ওরফে সবুজ মিয়াকে শিকল ও তালা দিয়ে বেঁধে রাখার অভিযোগ উঠেছে তাঁর দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্পত্তির বিরোধের জেরে তাঁকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বানিয়ে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। তবে পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বলেই নিরাপত্তার কারণে তাঁকে বেঁধে রাখা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামে। সরেজমিনে দেখা যায়, একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরের তিনটি খুঁটির সঙ্গে একাধিক তালা দিয়ে শিকল আটকানো। সবুজের দুই পায়েও তালা লাগানো রয়েছে। দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় থাকায় ঘরের ভেতর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। খাবার খাওয়া, ঘুমানো এবং মলমূত্র ত্যাগ—সবকিছুই তাঁকে বাঁধা অবস্থায় করতে হচ্ছে।
সাংবাদিকদের দেখে ৪৫ বছর বয়সী সবুজ নিজেকে সুস্থ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সুস্থ ছিলাম। সম্পত্তির লোভে আমার দুই ভাই আমাকে বেঁধে রেখে পাগল বানিয়েছে। আমার বাঁধন খুলে দেন।’ এ সময় তিনি ইংরেজিতেও কয়েকটি কথা বলেন।
সবুজের একমাত্র ছেলে ১২ বছর বয়সী আনন্দ চৌধুরী বাবাকে শিকলে বাঁধা অবস্থায় দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে বলে, ‘সবার বাবা সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যায়, ঘুরতে নিয়ে যায়। কিন্তু আমার বাবা শিকলে বাঁধা। আপনারা আমার বাবার বাঁধন খুলে দেন।’
স্থানীয় আব্দুল মোতালেব, নূরুল ইসলাম, সুজন ফকিরসহ কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সবুজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন এবং মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রায় আড়াই বছর আগে সম্পত্তি লিখে নেওয়া ও বাবার ভাতার টাকা নিয়ে বিরোধের পর সবুজকে তাঁর দুই ভাই আব্দুল মতিন ও খোরশেদ আলম শিকলে বেঁধে রাখেন। এলাকাবাসীর দাবি, তাঁকে যথাযথ চিকিৎসাও করানো হয়নি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সবুজের মা জহুরা খাতুন। তিনি বলেন, প্রায় ৩২ বছর ধরে তাঁর ছেলে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আগে ওষুধ খেলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে তাঁর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে যায়। মানুষের বাড়িতে ঢুকে পড়া ও বিরক্ত করার কারণে বাধ্য হয়েই তাঁকে শিকলে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সবুজের ভাই খোরশেদ আলমও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমার ভাইকে অনেক চিকিৎসা করানো হয়েছে, এখনো চিকিৎসা চলছে। আমরা তিন ভাই একসঙ্গেই আছি। তাই সম্পত্তি ভোগ করার প্রশ্নই ওঠে না।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, সবুজ একসময় ময়মনসিংহ শহরে কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।
এদিকে সবুজের চিকিৎসার কাগজপত্র দেখতে চাওয়া হলে পরিবারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দেখানো সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর প্রকৃত মানসিক অবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একদিকে পরিবারের দাবি, সবুজ দীর্ঘদিনের মানসিক রোগী; অন্যদিকে স্থানীয়দের দাবি, সম্পত্তির বিরোধে তাঁকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছে। দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে—একজন মানুষকে প্রায় দুই বছর ধরে শিকলে বেঁধে রাখার চিকিৎসাগত ও আইনগত ভিত্তি কী? স্থানীয়রা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।