
দৃশ্যপট ডেস্ক রিপোর্ট
সিরাজগঞ্জে রায়গঞ্জ জরাজীর্ণ ভাঙ্গাচোরা টিনের ঘর এখন ২০টি রাজবংশী পরিবারের নিত্যসঙ্গী। দীর্ঘকাল ধরে এই জনপদে বসবাস করলেও উন্নয়নের ছোঁয়া যেন আজও পৌঁছায়নি তাদের জরাজীর্ণ ঘরগুলোতে। রোদ-বৃষ্টি কিংবা হাড়কাঁপানো শীত, সব ঋতুতেই চরম ঝুঁকি আর মানবেতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে এই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর।
বিপজ্জনক আবাসন ও মানবেতর জীবন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের জামতৈল আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় গত ২০০০সনের দিকে ৮০টি পরিবার ঠাই নেয় । এরমধ্যে ২০টি রাজবংশী পরিবার রয়েছে। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ায় ঘরগুলো এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে অধিকাংশ পরিবারের ঘরগুলো অত্যন্ত নাজুক। টিনের তৈরি পুরনো ঘরগুলো সংস্কারের অভাবে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে চাল দিয়ে পানি পড়ে ঘরের আসবাবপত্র ভিজে যায়, আর শীতকালে ভাঙা বেড়া দিয়ে আসা হিমেল বাতাসে শিশু ও বৃদ্ধরা প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব এবং সুপেয় পানির সংকটে তাদের জীবনযাপন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এক সময় মাছ ধরা ও কৃষিকাজ রাজবংশীদের আয়ের প্রধান উৎস থাকলেও বর্তমানে নদী-নালার নাব্য হ্রাস এবং খাস জলাশয় ইজারা পদ্ধতিতে প্রভাবশালীদের দাপটে তারা পেশাচ্যুত হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং পুঁজির স্বল্পতায় অনেকেই এখন দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে আবার ঢাকায় চলে গেছে কাজের সন্ধানে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে সামান্য আয়ে পরিবার চালানো তাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া প্রজন্ম দারিদ্র্যের কারণে এই সম্প্রদায়ের সন্তানদের বড় একটি অংশ প্রাথমিক গ-ি পার হওয়ার আগেই ঝরে পড়ছে। জরাজীর্ণ ঘরে পড়াশোনার পরিবেশ না থাকা এবং পরিবারের অভাব মেটাতে অল্প বয়সেই কাজে যোগ দেওয়া তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বৃদ্ধা মালা রাজবংশী(৭০) বলেন,ছেলে পুত্র নেই,একটি মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। কেউ ফিরেও তাকায়না। ঝড়বৃষ্টি এলে ঘরের মধ্যে বসে থাকতে হয়। পাশেই বাস করেন সুকুমার রাজবংশী। তিনি বলেন,২০বছর আগে ঘর দিয়েছে সরকার। এরপর আর মেরামত নেই। খুটিগুলো ভেঙ্গে গেছে। বালি আর পলেস্তারা খসে পড়েছে। যেকোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে। এলাকায় কর্ম নেই। জীবনের তাগিদে এখন ঢাকায় থাকি। স্ত্রী পুত্র ঝুঁকি নিয়েই ঘরে থাকছে।
এছাড়াও আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাস করে আরও ৬০টি পরিবার। যাদের কিছু টাকা পয়সা রয়েছে তারা কিছুটা মেরামত করেছে। আবার অনেকে ভাঙ্গা ঘরেই মানবেতর জীবনযাপন করছে। আম্বিয়া নামে এক বিধবা বলেন,২৬বছর ধরে এখানে রয়েছি। সরকার যদি ঘরগুলো মেরামত করে দিত তাহলে কিছুটা উপকার হত। প্রকল্পের ৬নং ঘরে বসবাস করেন লাকি খাতুন। সে জানায়,কয়েকটি গরু লালন পালন করেছি। থাকার যায়গা না থাকায় এপাশে গরু অন্য পাশে আমাদের থাকতে হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে প্রয়োজন সরকারি হস্তক্ষেপ, রাজবংশী সম্প্রদায়ের এই আদি ঐতিহ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং কর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। পরিচয় আর ঐতিহ্যের লড়াইয়ে টিকে থাকা এই মানুষগুলোর দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন তাদের এই দুরাবস্থা নিরসনে দ্রুত এগিয়ে আসেন, যাতে তারা অন্তত মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ নিয়ে সম্মানের সাথে জীবন অতিবাহিত করতে পারে।
রায়গঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ রাশেদুল ইসলাম বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পটি পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করা হবে। বরাদ্ধ পাওয়া গেলে এসমস্ত পরিবারের বাড়িঘর মেরামতসহ তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।