ন্যাশনাল ডেস্কঃ
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। কপালে স্পষ্ট বয়সের ছাপ, আগের মতো শক্তি নেই শরীরে। তবুও থেমে নেই জীবনসংগ্রাম। সংসারের অভাব-অনটন আর জীবিকার তাগিদে ৭৫ বছর বয়সেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নারিকেল গাছে ওঠেন আব্দুল জলিল মিয়া। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়নের বাহাদিয়া ইমামনগর গ্রামের এই বৃদ্ধের জীবনের পাঁচ দশকের বেশি সময় কেটেছে নারিকেল গাছ পরিষ্কার ও পরিচর্যার কাজে।
মাত্র ২০ বছর বয়সে নারিকেল গাছ পরিচর্যার পেশায় যুক্ত হন জলিল মিয়া। এরপর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। বয়স ৭৫ হলেও এখনও সিংগাইর ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গাছের মালিকদের অনুরোধে নারিকেল গাছ পরিষ্কার, শুকনা ডাল কাটা, গাছের গোড়া ও নারিকেলের গুচ্ছ পরিষ্কার এবং নারিকেল পেড়ে দেওয়ার কাজ করে চলেছেন তিনি।
তবে এই কাজ মোটেও সহজ নয়। প্রতিদিনই তাকে উঠতে হয় উঁচু নারিকেল গাছে। শুকনা ডাল ও ডাওগা কাটা কিংবা গাছের পরিচর্যার সময় সামান্য অসতর্কতাই ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমে গেলেও সংসারের প্রয়োজন তাকে থামতে দেয় না।
জলিল মিয়ার সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে, ছেলের বউ, দুই নাতি ও এক নাতনিসহ মোট সাতজন সদস্য। তার ছেলে গাজীপুরের একটি সুতার কারখানায় কাজ করেন। মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। সাত সদস্যের সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটাতে এই আয় যথেষ্ট নয়। ফলে পরিবারের বাড়তি প্রয়োজন মেটাতে বৃদ্ধ বয়সেও জলিল মিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় কাজ করতে হচ্ছে।
নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আব্দুল জলিল মিয়া বলেন, “২০ বছর বয়স থেকে গাছ ঝুরার কাজ করছি। এ কাজ করেই ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সংসার চালিয়েছি। আগে দিনে অনেক গাছে উঠতে পারতাম। এখন বয়স হয়েছে, শরীর আগের মতো চলে না। অভাবের সংসার। তাই বাধ্য হয়ে এখনও মাসের ১০ থেকে ১৫ দিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নারিকেল গাছ পরিষ্কার ও পরিচর্যার কাজ করি।”
স্থানীয়রা জানান, ৭৫ বছর বয়সেও কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করছেন জলিল মিয়া। দীর্ঘদিন ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েও তার কর্মস্পৃহা অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার।
তাদের মতে, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা একজন বৃদ্ধের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। পারিবারিক আর্থিক সংকট ও বয়স বিবেচনায় সরকারি কিংবা বেসরকারি সহায়তা পেলে জলিল মিয়ার জীবনের শেষ সময়টা কিছুটা স্বস্তিতে কাটতে পারে।
স্থানীয়রা আরও বলেন, একসময় গ্রামবাংলায় নারিকেল গাছ পরিচর্যার কাজে এমন দক্ষ শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা ছিল। আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে উঁচু গাছে উঠে নারিকেল পরিষ্কার ও পরিচর্যার এই পুরোনো পেশা এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। সেই সময়ে ৭৫ বছর বয়সেও আব্দুল জলিল মিয়া ধরে রেখেছেন তার দীর্ঘদিনের পেশা।
জীবনের পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে গাছের ডালে ডালে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা জলিল মিয়ার গল্প শুধু একজন শ্রমজীবী মানুষের গল্প নয়; এটি অভাবের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এক প্রবীণ মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। বয়স তাকে নুইয়ে দিয়েছে, কিন্তু হার মানাতে পারেনি তার কর্মস্পৃহাকে।
সূত্রঃ দৈনিক ডেসটিনি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat