রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ )প্রতিনিধি
দুই পাশে প্রমত্তা ফুলজোড় নদী, আর একপাশে বিশাল বোয়ালিয়ার চর বিল। মাঝখানে দ্বীপের মতো জেগে থাকা এক জনপদ—সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের তিন-নান্দিনা গ্রাম।
উপজেলার মধ্যে সবচাইতে বেশি শিক্ষিতের হার এই গ্রামটিতে। গ্রামে রয়েছে একটি উচ্চ বিদ্যালয়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র। অথচ, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও এই গ্রামের হাজারো মানুষের ভাগ্যে জোটেনি ফুলজোড় নদীর ওপর একটি সেতু। বর্ষা, শীত কিংবা গ্রীষ্ম—ছয় ঋতুতেই নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা এখন শুধুই নৌকা।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষা-দীক্ষায় রায়গঞ্জ উপজেলার মধ্যে তিন নান্দিনা গ্রামটি বেশ এগিয়ে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উচ্চ পদে কর্মরত রয়েছে। কিন্তু গ্রামের প্রবেশমুখেই যেন থমকে যায় সব উন্নয়ন। একটি সেতুর অভাবে প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চাকরিজীবী এবং মুমূর্ষু রোগীদের চরম ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হতে হয়। বর্ষাকালে এই দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়, যখন চারদিকের পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদীটি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে গিয়ে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার তিন-নান্দিনা গ্রাম এবং সংলগ্ন বোয়ালিয়ার চর বিলের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এখানে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, সবজিসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু যোগাযোগের সুব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সঠিক সময়ে বড় বাজারে নিয়ে যেতে পারেন না। গ্রামের এক ভুক্তভোগী কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা রক্তজল করে ফসল ফলাই। কিন্তু নদী পার করে বাজারে নিতে যে খরচ আর কষ্ট, তাতেই অর্ধেক লাভ শেষ। বাধ্য হয়ে পাইকারদের কাছে বাড়িতেই পানির দামে ফসল বিক্রি করে দিতে হয়। আমাদের শিক্ষা আছে, কিন্তু পেটের ভাত জোগানোর রাস্তাটা নদী গ্রাস করে রেখেছে।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন স্কুল শিক্ষক বলেন, নির্বাচনের সময় এলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই গ্রামে এসে ফুলজোড় নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জোরালো প্রতিশ্রুতি দেন। ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেন না। বছরের পর বছর ধরে শুধু আশ্বাসের বাণীই শুনে আসছেন তারা, কিন্তু সেতুর দাবি আজও অবহেলিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা—সব ঋতুতেই গ্রামটিকে রায়গঞ্জ উপজেলার একটি বিচ্ছিন্ন ছিট মহল বলে মনে হয়।
সাহেবগঞ্জ বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ ৫৪ বছরের দুর্ভোগের একটি সেতু কেবল তিন নান্দিনা গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ করবে না, বরং এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে । উপজেলার সবচেয়ে শিক্ষিত এই গ্রামের মানুষ আর কতদিন নৌকার ওপর নির্ভর করে থাকবে, এমনটাই প্রশ্ন এই এই ব্যবসায়ী মহলের।
তিননান্দিনা রশিদা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এনামুল হক বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছি শুধুমাত্র একটি ব্রিজের জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রম করলেও আমাদের ভাগ্যে জোটেনি একটি ব্রিজ। নলকা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোঃ রেজাউল করিম বলেন, তিন নান্দিনা গ্রামটি সকল প্রকার যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। মানুষের দুর্ভোগকে এড়াতে সেখানে একটি ব্রিজ অবশ্যই প্রয়োজন। একটি সেতু এলাকাবাসীর এখন প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
রায়গঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ রবিউল আলম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দুটি প্রোজেক্টের মাধ্যমে তিন নান্দিনা গ্রামের পাশে ফুলজোড় নদীর উপর ব্রিজের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে একই নদীর সাহেবগঞ্জ-কে সি ফরিদপুর এলাকায় একটি ব্রিজ (কাজ চলমান) হওয়ার কারণে তিন নান্দিনাতে ব্রিজের গুরুত্বটা অনেকটাই কমে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এলাকাবাসীর আকুল আবেদন, বর্তমান সরকার যেন দ্রুত এই ফুলজোড় নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করে তিন নান্দিনা গ্রামবাসীর দীর্ঘ ৫৪ বছরের লালিত স্বপ্ন ও ন্যায্য দাবি পূরণ করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat