রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে প্রায় ২৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ছয় বছর আগে। কিন্তু এখনো চালু হয়নি প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান অবকাঠামো ছয় লাখ লিটার ধারণক্ষমতার জলাধার। ফলে সংযোগ নেওয়ার পরও প্রায় ৭০০ গ্রাহক বছরের পর বছর বিশুদ্ধ পানির সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, দেশের ৩০টি পৌরসভায় বাস্তবায়িত পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় রায়গঞ্জ পৌরসভায় এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০২০ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে।
সরেজমিনে পৌর শহরের ধানগড়া পালপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জলাধারের মূল অবকাঠামোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে এখনো চালু হয়নি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় দুই হাজার গ্রাহকের কাছে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০০ গ্রাহক সংযোগ নিয়েছেন। সংযোগ ফি হিসেবে জামানত বাবদ প্রতিজনের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫২০ টাকা। প্রতি এক হাজার লিটার পানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ টাকা। প্রতিটি সংযোগে মিটারও বসানো হয়েছে। কিন্তু সংযোগ নেওয়ার দীর্ঘ সময় পরও এক ফোঁটা পানিও পাননি গ্রাহকরা।
গ্রাহক দিজেন পাল বলেন, "পানি পাওয়ার আশায় নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে সংযোগ নিয়েছিলাম। তখন বলা হয়েছিল দ্রুত পানি সরবরাহ শুরু হবে। কিন্তু বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও কোনো সেবা পাইনি। বাধ্য হয়ে নিজ খরচে সাবমার্সিবল বসাতে হয়েছে।"
গৃহবধূ ছবি পাল বলেন, "বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার আশায় টাকা জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু শুধু আশ্বাসই পেয়েছি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে আলাদা নলকূপ স্থাপন করতে হয়েছে।"
রনজিৎ দাস বলেন, "সংযোগ নেওয়ার সময় মনে হয়েছিল পৌরসভার পানি পেলে উপকার হবে। কিন্তু বাস্তবে সংযোগ আছে, পানি নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজস্ব ব্যবস্থায় পানির সমস্যা সমাধান করেছি।"
ভানু রাম পাল বলেন, "পানির জন্য দীর্ঘদিন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এখন এলাকায় টিউবওয়েল ও সাবমার্সিবলের মাধ্যমে পানির সংকট অনেকটাই কেটে গেছে। তাই এতদিন পর প্রকল্প চালু হলেও মানুষ কতটা আগ্রহী হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।"
গ্রাহকদের অভিযোগ, পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ নেওয়া হলেও বছরের পর বছর সেবা না পাওয়ায় পৌরসভার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রায়গঞ্জে বড় ধরনের পানিসংকট না থাকায় শুরু থেকেই প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনেকের মতে, মফস্বল এলাকার মানুষ এখনো টাকা দিয়ে পানি ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। ফলে প্রকল্প চালু হলেও পর্যাপ্ত গ্রাহক পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, জলাধার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া ২ হাজার ৮০০ মিটার ড্রেন নির্মাণে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং পাইপলাইন স্থাপনে আরও ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এন অ্যান্ড সি কেটি (জেভি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৭০ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের রায়গঞ্জ উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, "এটি একটি বৃহৎ প্রকল্প। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতেই ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে।"
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এন অ্যান্ড সি কেটি (জেভি)-এর স্বত্বাধিকারী নুরুল আলম টিটু বলেন, "প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় জলাধারটি চালু করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেই পানি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।"
রায়গঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, "সরকার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করেই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই পানি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।"
এ বিষয়ে রায়গঞ্জ উপজেলার ভুইয়াগাঁতী পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. নিজামুল ইসলাম বলেন, "বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় মিটার স্থাপন করা হবে।"
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat