শ্যামল হালদার,রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
সারাদেশে জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার যখন খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তখন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছীতে ঘটেছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। সরকারি মৎস্য চাষ প্রকল্পের উন্নয়ন কাজের অংশ হিসেবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বছরের পুরোনো একটি পানি নিষ্কাশন ক্যানেল ভরাট করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এতে এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
রোববার (১৪ জুন) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিমগাছী মৎস্য চাষ প্রকল্পের পাশ দিয়ে প্রবাহিত দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন ক্যানেলটি মাটি ফেলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের পুকুর সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে থাকা সহকারী পরিচালক মাসুদ রানার নির্দেশনায় ক্যানেলটি ভরাট করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি এবং আশপাশের এলাকার জমে থাকা পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ক্যানেলটি কয়েক দশক ধরে নিমগাছী এলাকার প্রধান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। বর্ষা মৌসুমে এই ক্যানেল দিয়েই আশপাশের বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি জমির পানি দ্রুত নেমে যেত। কিন্তু সম্প্রতি ক্যানেলটি বন্ধ করে দেওয়ার পর সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকছে দিনের পর দিন।
সরেজমিনে ক্যানেলসংলগ্ন পুতুল রানী, কার্তিক মাহাতো, দীপক পোদ্দার ও স্বদীপ মালিসহ একাধিক পরিবারের বাড়িতে হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। ভুক্তভোগীরা জানান, পানি জমে থাকার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে, পাশাপাশি বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ক্যানেলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এলাকার একটি হ্যাচারি, ৬০টিরও বেশি বসতবাড়ি এবং দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে তারা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্যানেলটি পুনরায় উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং কর্মকর্তার ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণের কারণে সাধারণ মানুষ নিজেদের অসহায় মনে করছেন।
সোনাখাড়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য রামকৃষ্ণ গুণ বলেন,“একজন কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে পুরো এলাকার মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
সোনাখাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার বলেন,“জনস্বার্থে দ্রুত ক্যানেল থেকে মাটি অপসারণ করে পানি চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে। প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মৎস্য প্রকল্পের সহকারী পরিচালক মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে নিমগাছী মৎস্য চাষ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এম. শহিদুল ইসলাম বলেন,“বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে কীভাবে দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসন করা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যার দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, পানি নিষ্কাশনে যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যখন সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খাল ও জলপথ পুনরুদ্ধার করে জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তখন একটি সরকারি প্রকল্পের উন্নয়নের নামে কীভাবে দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হলো? ক্যানেল ভরাটের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে।
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই সৃষ্ট এই জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসন না হলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত ক্যানেলটি পুনরুদ্ধার এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat