ন্যাশনাল।দৃশ্যপট ডেস্ক
মা— পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সবচেয়ে মায়াময় শব্দ। সন্তানের জীবনে প্রথম স্পর্শ, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম অনুভূতির নাম মা। তাই মাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা কোনো দিন-তারিখের প্রয়োজন না হলেও, পৃথিবীর কোটি মানুষ বছরের একটি দিন শুধু মায়ের জন্যই তুলে রেখেছে। আর সেই দিনটিই আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত মা দিবস নামে।
কিন্তু কবে, কীভাবে আর কার হাত ধরে শুরু হয়েছিল এই বিশেষ দিনটির যাত্রা? এর পেছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, আবেগ, সংগ্রাম আর এক মেয়ের মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসার গল্প।
পৃথিবীর সবচেয়ে মায়াময় মুখ মায়ের। মা শব্দটিতে যে পরিমাণ ভালোবাসা মিশে আছে, তা আর কোনো শব্দেই নেই। মায়ের জন্য ভালোবাসা অকৃত্রিম, চিরন্তন ও অনাবিল। জন্মের পর প্রথম মায়ের স্পর্শ পেয়ে দেহ-মনে শিহরণ জাগে মানবদেহের।
পৃথিবীর সভ্যতার উত্থান-পতনের যত গল্পই বলা হোক না কেন, মায়ের জন্য ভালোবাসার গল্পটি সব সময় একই মমতায় মাখা থাকবে। মায়ের হাসিমুখের তুলনা চলে না অনুভূতির ভাণ্ডারে জমে থাকা কোনো আনন্দ বা সুখের সঙ্গে।
অজস্র দুঃখ-বেদনার ঝড় সামলে রাখা সেই মমতাময়ীকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট দিনক্ষণের প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রতিটি দিনই সন্তানের জন্য মা দিবস। তবুও ব্যস্ত এই পৃথিবীতে একটি বিশেষ দিন শুধু মায়ের জন্য তুলে রাখার আকুলতা মানুষের বহু পুরনো। আজকের বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে যে মা দিবস পালিত হয়, তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, সংগ্রাম আর এক কন্যার অসামান্য জেদ।
মা দিবসের ধারণাটি কিন্তু হুট করে আসেনি। প্রাচীন গ্রিস-এ প্রতি বসন্তকালে দেবতাদের মা ‘রিয়া’-র উদ্দেশ্যে উৎসব পালন করা হতো। যদিও সেই আয়োজন বর্তমানের মতো ব্যাপক ছিল না, তবুও মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর বীজ রোপিত হয়েছিল তখনই।
পরবর্তীকালে সপ্তদশ শতকে ব্রিটেনে মে মাসের চতুর্থ রবিবারকে ‘মাদারিং সানডে’ হিসেবে পালন শুরু হয়। এদিন মানুষ মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং উপহার দিতেন।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় ১৮৫৮ সালে প্রথমবারের মতো মা দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জুনের ২ তারিখকে বেছে নেওয়া হয়েছিল মা দিবস হিসেবে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন প্রথমবারের মতো মা দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন।
আবার কথিত আছে, প্রায় ১৫০ বছর আগে এক রবিবার সকালে মার্কিন সমাজকর্মী অ্যানা জার্ভিসের জীবনে জন্ম নেয় এক নতুন অনুভব। নিজের প্রতিষ্ঠিত সানডে স্কুলে শিশুদের বাইবেল পাঠদান করতে গিয়ে তিনি বারবার নিজের মায়ের মুখচ্ছবি খুঁজে ফিরতেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় মায়ের প্রতি ভালোবাসাকে বিশেষভাবে সম্মান জানানোর ভাবনা।
আধুনিক মা দিবসের গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন সমাজকর্মী অ্যান জার্ভিস। তিনি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত আমেরিকায় নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন। ১৯০৫ সালে তার মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা জার্ভিস মায়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্প করেন। তিনি চেয়েছিলেন, বছরের অন্তত একটি দিন যেন পৃথিবীর সব মায়েরা বিশেষ সম্মান ও ভালোবাসা পান।
অ্যানা জার্ভিসের এই আন্দোলনে অনুপ্রেরণা ছিলেন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ডের মতো ব্যক্তিরাও। অবশেষে ১৯০৮ সালের ১০ মে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটন শহরের সেই চার্চে— যেখানে তার মা একসময় পড়াতেন— প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করেন অ্যানা জার্ভিস।
তার নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ১৯১৪ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে সরকারি ছুটির দিন ও মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯২০ সালের মধ্যে এ ধারণা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; বরং মাতৃত্বের গুরুত্ব ও প্রভাবকে স্বীকৃতি দেওয়ার বৈশ্বিক মঞ্চ।
কেন এত বিশেষ এই দিন?
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের অন্য যেকোনো বিশেষ দিনের তুলনায় মা দিবসে সবচেয়ে বেশি ফোন কল করা হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, দিবসটির তাৎপর্য মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে—
সকল মায়ের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা
মাতৃত্বের সার্বজনীনতাকে সম্মান জানানো
সমাজে মায়েদের সুগভীর প্রভাবের স্বীকৃতি
আজ মা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও আবেগের এক বৈশ্বিক উৎসব। দামি উপহার কিংবা জমকালো আয়োজনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি বাক্য—
‘মা, তোমায় অনেক ভালোবাসি।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat