অনলাইন ডেস্ক
শরীরে ভিটামিন ডি বাড়ানোর জন্য দিনে কতটা সময় রোদে থাকা উচিত, তা নিয়ে আছে বিভিন্ন ভুল ধারণা। বিশেষ করে শীতকালে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি হয়ে থাকে, কারণ ওই সময় সূর্যের আলো কম পাওয়া যায়। রোদ পোহানোকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অন্যতম অংশ হিসেবে দেখা হয়। সূর্যের আলো মানুষের রক্তচাপ কমাতে, হাড়-পেশি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।
তবে গরমকালেও কিছু মানুষের জন্য প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট সূর্যালোক প্রয়োজন হয়। আবার কারও কারও একটু বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় শরীরের তারতম্য অনুযায়ী ব্যবধান হয়ে থাকে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত, স্যানাটোরিয়ামগুলোতে রিকেটস ও যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য হেলিওথেরাপি অর্থাৎ সূর্যের আলোর চিকিৎসাগত ব্যবহার করা হতো এবং ‘স্বাস্থ্যকর গায়ের রঙ’কে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা হতো।
এক শতাব্দী পরে, সূর্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। গত ৫০ বছরে, ত্বকের ক্যানসারের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন করে ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং জনস্বাস্থ্য প্রচারণায় রোদ এড়িয়ে চলার দিকে ঝোঁক বেড়েছে। অন্যদিকে মানুষের সানস্ক্রিন ব্যবহার উৎসাহিত করা হয়েছে। অতিরিক্ত সূর্যের আলোয় থাকার সঙ্গে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকির যোগসূত্র থাকার প্রমাণ রয়েছে।
কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পরিমিত’ সূর্যালোকের সংস্পর্শ অর্থাৎ দিনের মধ্যভাগে সীমিত সময়ের জন্য রোদে থাকা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য, ভিটামিন ডি-এর মাত্রা এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এটি নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং বোধশক্তি ও ঘুমের উন্নতি ঘটায়। তাহলে প্রশ্ন উঠে কীভাবে আমরা বিপদগুলো এড়িয়ে এর উপকারিতা পেতে পারি, আর আমাদের আসলে কতটা সূর্যের আলো প্রয়োজন?
আমাদের সূর্যের আলোর প্রয়োজন কেন?
সূর্যের আলো থেকে পাওয়া ইউভিবি রশ্মি ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সাহায্য করে এবং হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে যত বেশি রোদে থাকা যাবে, তত বেশি উপকার হবে। পরিমিত সূর্যের আলো শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি করতে সাহায্য করে, যা হাড়ের স্বাস্থ্য এবং পেশীর কার্যকারিতার জন্য উপকারি। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, শরীরে ভিটামিন ডি-এর উচ্চ মাত্রা ক্যান্সারের প্রকোপ ও মৃত্যুহার কমানোর পাশাপাশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকিও কমায়।
তা ছাড়া সূর্যের আলো মানুষের রক্তচাপও কমায়। আবার যখন ইউভিএ রশ্মি আমাদের ত্বকে পড়ে, তখন তা নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে, যা আমাদের রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়। এতে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে আমাদের আসলে কতটা সূর্যালোক প্রয়োজন সে সম্পর্কে সুইডিশ নারীদের ওপর পরিচালিত একটি যুগান্তকারী গবেষণাকে ব্যাখ্যা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ২৯ হাজার ৫১৮ জন সুইডিশ নারীর ওপর পরিচালিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা রোদ এড়িয়ে চলেন, তাদের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। সানবেড ব্যবহারের সঙ্গে সামগ্রিক মৃত্যুহার এবং ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরতত্ত্বের অধ্যাপক রেবেকা মেসন বলেন যে, পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি গ্রহণ করলে তা প্রদাহ কমাতে, আক্রমণকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
কতক্ষণ রোদে থাকলে উপকার পাওয়া যাবে?
বয়স, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ত্বকের ধরন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা সাধারণত অল্প সময়ের জন্য ঘন ঘন রোদ পোহানোর পরামর্শ দেন।
মেসন বলেন যে, ভিটামিন ডি সংশ্লেষণের ক্ষেত্রে দিনের মধ্যভাগে অল্প অল্প করে এবং ঘন ঘন এর সংস্পর্শে আসা সবচেয়ে কার্যকর, যখন ইউভিবির মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে।
ফর্সা ত্বকের মানুষদের জন্য সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন নিয়মিত অল্প সময়ের জন্য রোদে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেখানে প্রতিবার কয়েক মিনিটের জন্য হাত-পা, বাহু অনাবৃত থাকবে। যেসব এলাকায় উচ্চ ইউভিবি রশ্মির প্রভাব রয়েছে, সেখানে এর পরিবর্তে সকালের মাঝামাঝি বা বিকেলের মাঝামাঝি সময়ে রোদ পোহানো উচিত।
যাদের গায়ের রঙ কালো, তাদের বেশি সূর্যালোকের প্রয়োজন হতে পারে, কারণ ত্বকে মেলানিনের মাত্রা বেশি থাকায় সূর্য থেকে ভিটামিন ডি তৈরি হতেও বেশি সময় লাগে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, যুক্তরাজ্যের বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে, গাঢ় বাদামি ত্বকের মানুষদের পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরির জন্য দুপুরবেলায় প্রায় ২৫ মিনিট সূর্যালোকের প্রয়োজন হয়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং বোস্টনের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন্স হসপিটালের একজন মেডিসিনের অধ্যাপক জোঅ্যান ম্যানসন বলেন, ‘দীর্ঘক্ষণ অরক্ষিত অবস্থায় রোদের সংস্পর্শে থাকা এড়িয়ে চলা উচিত, বিশেষ করে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে। সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের অল্প থেকে মাঝারি পরিমাণ রোদই যথেষ্ট।’
তবে, ‘ব্যায়াম করার মাধ্যমে বা বাইরে কোনো কাজ সারার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে রোদের সংস্পর্শে আসাও কার্যকর’- যোগ করেন তিনি।
অতিরিক্ত সূর্যের আলোয় থাকলে কী কী ঝুঁকি হয়?
অতিরিক্ত সময় রোদে কাটালে ভিটামিন ডি উৎপাদন বাড়ে না; বরং সানবার্ন, পিগমেন্টেশন ও অকাল বার্ধক্যের ঝুঁকি বাড়ে এবং এটি ত্বকের ক্যানসারের প্রধান কারণ।
যুক্তরাজ্যে অলাভজনক ক্যানসার রিসার্চ সংস্থা বলছে, অতিরিক্ত ইউভিবি রশ্মির সংস্পর্শ বা সানবেড ব্যবহার এর অন্যতম কারণ ধারণা করা হচ্ছে যে, প্রতি ১০টি ঘটনার মধ্যে ৯টিই প্রতিরোধযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রেও ত্বকের ক্যানসার সবচেয়ে সাধারণ, এবং এই বছর সেখানে ১,১২,০০০ মানুষ ইনভেসিভ মেলানোমায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পর্যাপ্ত সূর্যের আলো না পেলে কী হবে?
যেখানে সূর্যের আলো কম এরকম স্থানে বাস করলে শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে শীতকালে। যাদের গায়ের রঙ কালো, বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম, যাদের ফটোসেনসিটিভিটি বা আলো সংবেদনশীলতার সমস্যা আছে অথবা যারা নিজেদের শরীর ঢেকে রাখেন, তাদের ভিটামিন ডি-এর অভাবের ঝুঁকি থাকে। তাদের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতির ফলে হাড়ের বিকৃতি, যেমন রিকেটস বা অস্টিওম্যালাসিয়া হতে পারে।
তবে, বাজারে এমন অনেক সাপ্লিমেন্ট আছে যেগুলোর মাধ্যমে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি সহজেই পূরণ করা যায়। কিন্তু সকল প্রাপ্তবয়স্কদের ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের নির্দেশনা বয়স এবং দেশ-ভিত্তিক নির্দেশিকা অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, অল্প অল্প করে এবং ঘন ঘন রোদ পোহানোই সর্বোত্তম। দুপুরের দিকে অল্প সময়ের জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমরা রোদের উপকারিতা লাভ করার পাশাপাশি সানবার্ন ও ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমাতে পারি।
সূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat