সবুজ সরকার, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
ঘরের আঙ্গিনা জুড়ে কালচে পানি। পানির ওপর ভাসছে ময়লা-আবর্জনা। বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ে মশার উপদ্রব। এমন পরিবেশেই বছরের পর বছর বসবাস করছেন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার শেরনগর মধ্যপাড়ার কয়েক হাজার মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আশপাশের কয়েকটি প্রসেস মিল এবং পূর্বাণী গার্মেস্টসের পানি, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতার কারণে তাঁদের এই দুর্ভোগ। বৃষ্টি হলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শেরনগর মধ্যপাড়ার বিভিন্ন বাড়ির সামনে ও সরু সড়কে জমে আছে ময়লা মিশ্রিত পানি। কোথাও ড্রেনের পানি উপচে উঠছে। কোথাও আবার স্থির হয়ে থাকা পানিতে জন্ম নিয়েছে মশা। দুর্গন্ধে কয়েক মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।
এই এলাকার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল হালিম মন্ডল। একসময় তাঁতশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এখন বয়সের ভারে অনেকটাই কর্মহীন। ১৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে তাঁর বসবাস এই এলাকায়। ঘরের সামনে জমে থাকা নোংরা পানির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, আমাদের কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না। টিউবওয়েলের পানিতেও গন্ধ। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি উঠে যায়। এই এলাকার কথা শুনে অনেকে আত্মীয়তা করতে চায় না। ছেলে-মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এলে লোকজন এসে না বসেই চলে যায়।
তিনি জানান, মশার উপদ্রবে তাঁর স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ১৫-১৬ বছর ধরে এই ভোগান্তি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। পৌরসভা থেকে একবার মশা মারার ওষুধ ছিটিয়েছিল। কিন্তু মশা কমেনি, বরং আরও বেড়েছে মনে হয়।
শুধু আব্দুল হালিম নন, স্থানীয়দের দাবি, শেরনগর মধ্যপাড়া ও আশপাশের প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ পরিবারের অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ একই দুর্ভোগে আছেন।
স্থানীয় নারী আলেয়া বেগম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বৃষ্টি হলে ঘরে থাকা যায় না। পানি উঠে যায়। অনেক সময় আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হয়। আমরা গরিব মানুষ, কোথায় যাবো? সামনে ঈদ। আবার বৃষ্টি হলে ঘরে ঈদ করা কঠিন হবে।
এলাকাটিতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মসজিদ রয়েছে। জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়ছে শিশুদের জীবনেও।
স্থানীয় শিক্ষার্থী রাহাত বলে, বৃষ্টি হলে ১০-১৫ দিন পর্যন্ত স্কুলে যেতে পারি না। খেলাধুলাও করা যায় না। আমরা চাই এই সমস্যার একটা সমাধান হোক।
মোছা. হাশমত আরা নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, বৃষ্টি হলে কোমর পানি হয়। রান্নাবান্না করা যায় না। আমার স্বামী নাইট গার্ড। অন্য কোথাও গিয়ে থাকার সামর্থ্য আমাদের নেই।
স্থানীয় মুদি দোকানদার শমসের আলী বলেন, পানির গন্ধে দোকানে বসা কষ্ট হয়ে যায়। এভাবে কতদিন চলবে বুঝতে পারছি না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, মুকন্দগাতী, চন্দনগাতী, কামারপাড়া ও শেরনগরের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনের পানি এসে এই এলাকায় জমা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি প্রসেস মিলের বর্জ্যপানিও এখানে এসে পড়ছে।
তিনি বলেন, সঠিকভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা করে পানি বের করার ব্যবস্থা করলে হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তি কমবে।
তিনি অভিযোগ করেন, মাসখানেক আগে পৌরসভার উদ্যোগে এলাকায় লাখ লাখ টাকা একটি নালা খনন করা হলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সমস্যাটি চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধ ও মশার যন্ত্রণা নিয়েই দিন কাটছে শেরনগরের মানুষের।
বেলকুচি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন,পানি নিস্কাসনের জন্য পৌরসভার রাজস্ব তহবিল থেকে খাল খননের জন্য ১ কিলোমিটার কাজ শুরু করা হয়েছে। ৩শত মিটার খাল খনন শেষ হয়েছে। কিছু জটিলতার কারণে বাকি কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। জটিলতা শেষ হলে ৭শত মিটার খাল খনন পর্যায়ক্রমে শেষ করা হবে। পানি নিস্কাসনের জন্য মার্স্টার ড্রেন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ১ কিলোমিটার খাল খননে কত টাকা বাজেট হয়েছে জানতে চাইলে বলেন, ১৫-১৮ লাখ টাকার মতো হবে। তবে তিনি অফিসিয়ালি টাকার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে জানায়নি।
বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক আফরিন জাহান জানান, বিষয়টি পৌরসভা গুরুত্ব সহকারে দেখছে। এটার অংশ হিসেবে শেরনগর খাল/নালা খনন/সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া সহ নানাবিধ কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও তার আংশিক বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু করেছে। বর্তমান পৌর প্রশাসক কর্তৃক কয়েকবার সরেজমিনে শেরনগর এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রসেস মিলের বর্জ্য পানি বন্ধে পৌরসভা নিয়মিত মনিটরিং সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বর্গের সাথে পরামর্শ চালিয়ে যাচ্ছে। ঈদের পূর্বে ড্রেন পরিস্কার সহ রুটিন কাজ চলবে। এছাড়া জরুরী পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনে পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করা হবে।বেলকুচি পৌরসভা এলাকায় মাস্টার ড্রেন না থাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এমপি মহোদয়ের সাথে পরামর্শক্রমে শেরনগর ব্রীজ থেকে ক্ষিদ্রমাটিয়া স্লুইসগেট পর্যন্ত একটি মাস্টার ড্রেন প্রকল্প খুব দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হয়, যাপ্রক্রিয়াধীন আছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat