নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে প্রিয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যার অসংখ্য ইতিহাস। রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের হিংস্রতায় প্রাণ দিয়েছেন দেশের হাজার হাজার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। হানাদারদের বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি কৃষক, শ্রমিক, মজুরসহ তৃণমূলের খেটে খাওয়া মানুষও। পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার বাহিনীর হিংস্রতার শিকার পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকা অসংখ্য মানুষ সেসব ভয়ংকর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন আজও।
তেমনই একজন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কোনাগাঁতী গ্রামের সাধারণ তাঁতশ্রমিক আবু বক্কার খান। পাক বাহিনীর পৈশাচিক হামলার শিকার গয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেয়নেটের ক্ষতচিহ্ন আর গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ৫৬ বছর ধরে ক্ষতের স্থানে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তিনি। তবে দুঃখের বিষয়, এত বছরেও সরকারি বা বেসরকারি কোন সহযোগীতা বা সহমর্মিতা পাননি তিনি।
কোনাগাঁতী গ্রামের মৃত শুক্কুর আলী খানের ছেলে আবু বক্কার খান ব্তমানে শয্যাসায়ী। জীর্ণ টিনের ঘরে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে আছেন তিনি। একা একা চলতে পারেন না। স্ত্রীর সাহায্যে ঘর থেকে বাহিরে আসতে পারেন।
একাত্তরে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া পাক বাহিনীর বর্বরতার বিষয়ে জানতে চাইলে ফোকলা দাঁতে ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়। দেশে তখন পুরো যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে, গ্রামে গ্রামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। মানুষ সামনে পেলে গুলি করে মারছে। কেউ দৌড়ে পালিয়ে বাঁচতে পারছে। আবার কেউ গুলি খেয়ে মাটিতে ঢলে পড়ছে। গ্রামে আর্মিদের এসব ভয়ংকর অত্যাচার দেখে আমরা দুরে চলে গিয়েছি। কোনাগাঁতী ব্রীজের নীচে আমরা তিনজন পালিয়ে রয়েছি।
রাস্তার দক্ষিণ পাশে আর্মিরা নদীর দিকে যাচ্ছে, সেখানে পালিয়ে রয়েছে অনেক মানুষ। সেনাবাহিনীর মধ্যে একজনের বন্দুক লোড করেই ছিল। নেমেই শুরু করলো গুলি। আমরা ভয়ে আর আতংকে ব্রীজের নীচে লুকিয়ে রয়েছি। টু শব্দটি পর্যন্ত করছি না। হঠাৎ আমাদের দেখে ফেলে বললো, এধার আও। আমরা এগিয়ে গেলাম। কোন কথা নেই আমাদের তাক করে গুলি করলো। কয়েকটি গুলি মিসও গেল। বুঝলাম আমার আর বাঁচার পথ নাই, আল্লাহ আজ আমাদের এভাবেই মৃত্যু রেখেছে। আমি পেছাতে লাগলাম। এদিকে গুলি হচ্ছে। এরপর আর কি হয়েছে বলতে পারি না।
আবু বক্কার খান আরও বলেন, অনেক পরে জ্ঞান ফিরে দেখলাম দুজন মারা গেছে। আরেকজন গরু জবাই করলে যেমন শব্দ করে তেমন শব্দ করছে তার মুখ দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে। আমার শরীরে রক্ত দেখছি না। তখন আমি ভাবলাম আমার তো কিছুই হয় নাই। গামছাটা পেতে শুয়ে থাকার কথা ভাবলাম। কিন্তু চিন্তা করলাম যদি আর্মিরা আবার ফিরে আসে। আমার অশ্বস্তি লাগছিল। আমার পিঠের দিকে বিরবির করছিল, তখন পেছনে হাত দিয়ে দেখি তিনটা আঙ্গুল ঢুকে পড়েছে, আর সারা পিঠে রক্ত।
পাশের বাড়ির একজন লোক নদীর মধ্যেই পালাইয়া ছিল। আমি হাত দিয়ে ইশারা করতেই সে নদীতে ঝাপ দিল। আবার ইশারা করার পর আমার কাছে এসে হাত-পা ধরে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলো। পরে আরও লোকজন এসে কাঁথার মধ্য জড়িয়ে আমাকে নদীর মধ্যে নিলো। খুব পিপাশায় নদীর পানিই খেলাম। গ্রামের পল্লী ডাক্তার এসে ব্যান্ডেজ করে দিল।
পরে শুনলাম আমার পাঁজরে, পিঠে বেয়নট দিয়ে খুচিয়েছে। ডান পাজরের নিচ চামরার উপর দিয়ে গুলি চলে গেছে। আমার জ্ঞান না থাকায় মৃত ভেবে চলে গেছে পাকিস্তানী আর্মিরা।
মায়ের ১০ আনি গয়না বেঁচে আমার চিকিৎসা হয়। হালের গরু বেঁচে চিকিৎসা হলো। কখনো কোন সরকারি সহযোগীতা পাইনি। তিনি বলেন, এখনো আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাথা করে। যেখানে বেয়নটের আঘাত আছে সেখানে চুলকায়, ব্যাথা করে।
আবু বক্কার খানের স্ত্রী সোনাভানু বলেন. স্বাধীনতার ৪ বছর পর আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে দেখছি, আমার স্বামীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাথা করে। এর আগে আঘাতের এক স্থানে ঘা হয়ে গিয়েছিল।
ছেলে মাহমুদুল হাসান খান বলেন, ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, আমার বাবাসহ ৪ জন পাকিস্তানীদের দেখে ব্রীজের নীচে পালিয়েছিল। তাদের মধ্যে তিনজন গুলি খেয়ে মারা গেছে। আমার আব্বার শরীরে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করেছে। অসুস্থ্য জীবন নিয়েও বাবা আমাদের ভাইবোনদের মানুষ করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat