ন্যাশনাল ডেস্ক
দেশের ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে বানাই জনগোষ্ঠী একটি। একসময় সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বানাই জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তবে স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে বানাই জনগোষ্ঠী। এখন তাদের অস্তিত্ব কেবল সরকারি নথি, স্থানীয় মানুষের স্মৃতি আর ‘বানাই টিলা’র মতো কিছু নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
জানা যায়, নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ও রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের নাকুগাঁও এবং বানাই চিরিংগীপাড়া গ্রামে একসময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বানাই পরিবারের বসবাস ছিল। নাকুগাঁও স্থলবন্দর এলাকার পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় কয়েকটি টিলা বা পাহাড় স্থানীয়দের কাছে এখনো ‘বানাই টিলা’ নামে পরিচিত। একইভাবে বানাই জনগোষ্ঠীর বসতির কারণে একটি গ্রামের নাম হয় ‘বানাই চিরিংগীপাড়া’।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত শুধু নালিতাবাড়ীতেই তিন শতাধিক বানাই পরিবারের বসবাস ছিল। এর মধ্যে শতাধিক পরিবার থাকত বানাই টিলা এলাকায়। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে একসময় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই জনপদ থেকে হারিয়ে গেছে বানাইরা। এখন শেরপুরের বিভিন্ন নথিতে তাদের নাম থাকলেও বাস্তবে নেই কোনো বানাই জনগোষ্ঠীর বসতি।
জানা যায়, ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ এলাকার অনেক বানাই পরিবার ভারতে চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েকটি পরিবার নাকুগাঁও ও বানাই চিরিংগীপাড়ায় ফিরে এলেও তারা দেখতে পায়, তাদের বাড়িঘর ও জায়গাজমি অন্যের দখলে চলে যাওয়াসহ নানা সংকটের কারণে পরবর্তী সময়ে তারাও ভারতে চলে যায়। সবশেষ ১৯৭১ সালের নাকুগাঁও এলাকায় আসকর বানাই এবং বিবি মনি বানাইয়ের পরিবার ছিল; কিন্তু তারাও খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে ১৯৮০ সালে মারা যায় বলে জানান তাদের মেয়ে আঁখিতারা বানাই। আঁখি তারা বানাই বর্তমান নাম আঁখি তারা ম্রং।
বানাই জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তির কারণ সম্পর্কে দাওধারা এলাকার প্রবীণ আদিবাসী নেতা যুবরাজ কোচ বলেন, ‘আমরা আদিবাসীরা আগে থেকেই নিরীহ স্বভাবের মানুষ। কারও সঙ্গে ঝগড়া-ঝামেলায় জড়াই না। রায়টের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আমাদের বাড়িঘর লুটপাট করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখনই বানাইরা ভারতে চলে যায়।’
বেসরকারি সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আদিবাসী শুমারি-২০২১-এর তথ্য অনুযায়ী, শেরপুর জেলার পাঁচটি উপজেলার কোথাও বানাই জনগোষ্ঠীর মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে আদিবাসী অধ্যুষিত এ পাহাড়ি জনপদে ‘বানাই’ এখন কার্যত বিলুপ্ত একটি জনগোষ্ঠীর নাম।
ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার আদিবাসী নেতা বিশ্বেশ্বর বানাই জানান, বানাইদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে এবং তারা নিজেদের মধ্যে এ ভাষায় কথা বলতেন। বানাই ভাষায় সংখ্যাগুলো হলো—একং (১), বেকং (২), তুলসী (৩), লেকং (৪), লাই (৫), লতা (৬), ভগরী (৭), গুতা (৮), ভেড়া (৯) এবং ঠেং থাকা (১০)।
বানাইরা সনাতন ধর্মাবলম্বী। কামাখ্যা পূজা, দুর্গাপূজা ও কালীপূজার পাশাপাশি ‘বাস্তু পূজা’ ছিল তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় আচার। তারা পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অনুসারী হলেও ‘নিকনী’ নামে একটি মাতৃগোত্রভিত্তিক বিয়ের রীতি প্রচলিত ছিল। বানাই নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নাম ‘রাঙা পাতিন’।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat