অনলাইন ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঘটনায় ভারতের কয়েকটি রাজ্যেও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হিমালয় থেকে নেমে আসা বেশ কয়েকটি বড় নদী নেপাল হয়ে ভারতের সমতলে প্রবাহিত হওয়ায় দুই দেশের নদীব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
নেপাল থেকে ভারতে প্রবাহিত প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে কোসি, গণ্ডক, কর্ণালি ও মহাকালী। ভারতের অংশে কর্ণালি ঘাঘরা এবং মহাকালী শারদা নামে পরিচিত। এ ছাড়া বাগমতী, কামলা, রাপ্তি ও বাবাইসহ বেশ কয়েকটি ছোট নদীও নেপাল থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট বা আইসিমডের জলবিদ মণীশ শ্রেষ্ঠার মতে, নেপাল থেকে ভারতের সমতলে ৭-৯টি বড় নদী প্রবাহিত হয়। এসব নদী ভারতের বন্যার অন্যতম উৎস।
ভারতের বিহার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। উত্তর বিহারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা বন্যাপ্রবণ। কোসি, গণ্ডক, বাগমতী, কামলাসহ বিহারের বন্যা সৃষ্টিকারী বেশির ভাগ বড় নদীর উৎস নেপালে।
বিহারের পাশাপাশি উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকাও নেপালের নদীগুলোর কারণে বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। উত্তর প্রদেশের গোরখপুর, বাহরাইচ, লখিমপুর খেরি ও শ্রাবস্তী নিয়মিত বন্যার কবলে পড়ে। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় মেচি ও মহানন্দা নদীর প্রভাব রয়েছে।
আইসিমডের জলবিদ প্রদীপ মান ডাঙ্গোল বলেন, বন্যার ব্যাপ্তির দিক থেকে বিহার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এরপর রয়েছে উত্তর প্রদেশ, যদিও সেখানে বন্যার ঝুঁকি অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
নেপালের বৃষ্টিপাতের পর সীমান্তে নদীর পানির সর্বোচ্চ প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করে নেপালের পরিস্থিতির ওপর। তবে ভারতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে ভারতের বৃষ্টিপাত, নদীর পানির উচ্চতা, বাঁধ ও ব্যারাজের অবস্থা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপরও।
আইসিমডের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক কর্মকর্তা শাশ্বত সান্যাল বলেন, সীমান্তে পৌঁছানো বন্যার পানির সর্বোচ্চ প্রবাহ অনেকটাই নেপালের বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে। তবে সেই পানি ভারতে গিয়ে কতটা ভয়াবহ বন্যা তৈরি করবে, তা অন্তত সমানভাবে ভারতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
স্বাভাবিক মৌসুমি বন্যার ক্ষেত্রে নেপাল থেকে ভারতের সমতলে পানি পৌঁছাতে প্রায় ১২ ঘণ্টা থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে। কোসি ও গণ্ডক নদীর পানি নেপালের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে বিহারের সমতলে পৌঁছাতে প্রায় এক দিন সময় নেয়। তবে চুরে অঞ্চলের ছোট নদীগুলোর আকস্মিক বন্যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতে পৌঁছাতে পারে।
সাম্প্রতিক নেপালের বন্যায় রাসুয়া থেকে আসা প্রবল ঢেউ ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি ত্রিবেণীতে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় নিয়েছিল।
নেপাল ও ভারত বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির উচ্চতার তথ্য আদান-প্রদান করে। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনকে এসব তথ্য দেয়। তবে দ্রুতগতির নদীগুলোর ক্ষেত্রে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের ঘাটতি রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন কোনো বন্যা পূর্বাভাস মডেলও নেই। বাঁধের অবস্থা, নদীর গতিপথের পরিবর্তন ও পলি জমার তথ্য আদান-প্রদানেও ঘাটতি রয়েছে বলে জানান সান্যাল।
২০০৮ সালে কোসি নদীর বাঁধ ভেঙে বিহারে বড় ধরনের বন্যা হয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রায় ৪০০ মানুষ মারা যায়। আইআইটি কানপুরের অধ্যাপক রাজীব সিনহার মতে, সে সময় নদীতে পানির পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি ছিল না। নদীর পানিপ্রবাহ ছিল বাঁধটির ধারণক্ষমতার প্রায় এক-দশমাংশ। পুরোনো ও দুর্বল বাঁধ ভেঙে যাওয়াই বড় বিপর্যয়ের কারণ ছিল।
সিনহা বলেন, ১৯৫০ ও ১৯৬০’র দশকে নির্মিত বাঁধগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। দীর্ঘদিনের ক্ষয় ও দুর্বলতার কারণে বাঁধে দুর্বল স্থান তৈরি হয়। পরে নদী সেই অংশ ভেঙে ভারতের এমন এলাকায় প্রবেশ করে, যেখানে প্রায় ১০০ বছর ধরে বড় ধরনের বন্যা দেখা যায়নি।
নেপাল থেকে ভারতে বন্যার পানি যাওয়ার প্রধান কারণ উজানে বৃষ্টিপাত। নেপালে এমন বড় জলাধারও খুব কম, যেখান থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেওয়া সম্ভব। কোসি ও গণ্ডক ব্যারাজ ভারতের নিয়ন্ত্রণে।
আইসিমডের শাশ্বত সান্যাল বলেন, নেপাল ‘ভারতে পানি ছেড়ে দেয়’ এ ধারণা অতিরঞ্জিত। বন্যার পানি সীমান্তে পৌঁছানোর মূল কারণ উজানে বৃষ্টিপাত। তবে নেপালের বৃষ্টিপাত ভারতে পৌঁছানো বন্যার পানির সময় ও পরিমাণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গঙ্গা নদীর বার্ষিক গড় পানিপ্রবাহের প্রায় ৪০ শতাংশের উৎস নেপাল। শুষ্ক মৌসুমে নেপালের অবদান আরও বেশি।
সাম্প্রতিক নেপালের বিপর্যয়ের মতো পাহাড়ি ঢলে শুধু পানি নয়, কাদা, পাথর, বরফ ও বিপুল পরিমাণ পলি একসঙ্গে নেমে আসতে পারে। এতে সাধারণ বন্যার তুলনায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে।
অধ্যাপক রাজীব সিনহা বলেন, নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় ভারতের ২০২১ সালের চামোলি ও ২০২৫ সালের ধরালি বিপর্যয়ের সঙ্গে তুলনীয়। তার মতে, নেপালের এবারের ঘটনা ওই ঘটনাগুলোর তুলনায় সম্ভবত পাঁচ থেকে ১০ গুণ বড়।
২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ার পর পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতে প্রায় ২০০ মানুষ মারা যায়। ২০২৫ সালে উত্তরাখণ্ডের ধরালিতেও আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
সিনহা বলেন, এসব ঘটনা সাধারণ বন্যা নয়। তীব্র বৃষ্টি, বরফ গলা বা হঠাৎ পানি নেমে আসার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলি মিশে গেলে শক্তিশালী কাদা-পাথরের স্রোত তৈরি হয়। এই স্রোত বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে চরম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঝুঁকি বাড়ছে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করায় কম সময়ে বেশি বৃষ্টির প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে হিমবাহ গলা, হিমবাহের হ্রদ ভেঙে পড়া এবং পাথর-বরফ ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
সূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat