ন্যাশনাল ডেস্ক
চল্লিশ বছর বয়সী কসাই রিপন আলী। গত ১ দশক ধরে গবাদি পশুর মাথা সংগ্রহের পর তা ব্যবহার করে অত্যন্ত নান্দনিক শোপিস তৈরির এক ব্যতিক্রমী কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। মাটি বা কাঠের শোপিসের প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে তিনি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাথাকে প্রক্রিয়াজাত করে শৈল্পিক শিল্পকর্মে রূপ দিচ্ছেন। বর্তমানে তার সংগ্রহে শতাধিক এমন শৈল্পিক শোপিস রয়েছে।
শুরুর দিকে অনেক উপহাস পোহানোসহ নানা বাধার সম্মুখীন হলেও অবশেষে এই কঠিন কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন তিনি। তার এই উদ্ভাবন এখন স্থানীয় দর্শনার্থীদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
রিপনের মূল লক্ষ্য- তার এই কাজকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া, যাতে বন্যপ্রাণী নিধন হ্রাস পায় এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
রোববার (৮ জুন) বিকেলে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে একটি রুমে তিনি এসব পশুর শিংসহ মাথাগুলো থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন।
রিপন আলী বলেন, এ বিষয়ে মানুষ এখনো সেইভাবে জানে না। এখানে গরু ও ছাগলের মাথা থেকে তৈরি শোপিস বেশি। তার পরে ভেড়া ও মহিষের রয়েছে। সবাই শিং ওয়ালা মাথা নেয় না। যে শিং ওয়ালা মাথা দেখতে আকর্ষণীয় শুধু সেগুলোই নেয়।
রিপন আলীর এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম তৈরির পেছনের গল্পটি দীর্ঘ ১০ বছরের। ধৈর্য, মেধা এবং একাগ্রতার এক অনন্য কাহিনি। তিনি জানান, কসাইয়ের কাজ করতে করতে একদিন মহিষের অনেক বড় শিং ওয়ালা মাথা দেখতে পান রাজশাহীর শালবাগান কসাইপট্টিতে। সেখানকার কসাই মাথা থেকে শিং আলাদা করে ফেলে। এরপরে শিংটি সংগ্রহ করেন তিনি। বিশাল শিং দেখে তার কয়েকজন বন্ধু সংরক্ষনের ধারণাটি দেন যে- প্রাণীর মাথা থেকে তৈরি জিনিসগুলো ভবিষ্যতে মূল্যবান শোপিস হতে পারে। এই ভাবনা থেকেই তিনি ২০১৭ সালে এই কাজ শুরু করেন।
রিপন আলী আরও জানান- শুরুর দিকে অনেকেই তাকে নিয়ে উপহাস ও অসহযোগিতা করেছিলেন। এমনকি তার পরিবারও পশুর হাড়ের দুর্গন্ধ এবং এতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে বিরক্ত ছিল। তবে এখন দৃশ্যপট বদলেছে; এখন তার পরিবার এবং দর্শনার্থীরা তার এই নান্দনিক কাজের প্রশংসা করছেন।
তিনি জানান, এই শিল্পকর্ম তৈরির সঠিক পদ্ধতি বা প্রসেস জানার জন্য তিনি অনেক বিশেষজ্ঞ এবং এমনকি ডাক্তারদের পেছনেও ঘুরেছেন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নিজের কঠোর পরিশ্রম এবং গবেষণার মাধ্যমে তিনি এই বিশেষ পদ্ধতিটি আয়ত্ত করেন।
উপকরণ সংগ্রহ হিসেবে তিনি তার কাজের জন্য কেবল দেশি গৃহপালিত পশুর (যেমন গরু, মহিষ ছাগল, ভেড়া) মাথা ব্যবহার করেন। যা তিনি বাজার থেকে কিনে নেন। এছাড়া বাঘ বা হরিণের মতো অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করেন না, যা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ বা অবৈধ।
অনেকেই এসেছেন তার এমন শিল্পকর্ম দেখতে। তবে তারা জানান- পশুর মাথা এমন ভাবে রাখা তারা দেখে এরআগে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা থেকে দেখতে এসেছেন মোকসেদ আলী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন থেকে জানি রিপন এই জিনিসগুলো তৈরি করে রেখেছে। জিনিসগুলা খুব ভালো, অনেক মূল্যবান জিনিস। বিশেষ করে রিপন কিছু ব্যয় করছে বা অনেক যত্ন করেছে। তো জিনিসগুলো আসলে খুব ভালো। সে কারণে আমার আসা। পছন্দ হলে আমি একটা নিয়ে যাব।
সুমাইয়া আক্তার বলেন- আমরা অনেক ধরনের শোপিস দেখেছি। পশুর মাথা ও শিং দিয়ে শোপিস তৈরি করা এই প্রথম দেখলাম। আইডিয়াটা আসল ইউনিট। এমন সাধারণত দেখা যায় না। এখানে আসার পরে দেখে অনেক ভালো লাগছে।
রাজশাহীর চারঘাট এলাকা থেকে রিপনের শোপিস দেখতে এসেছেন রাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, এমন শোপিস সচরাচর চোখে পড়ে না। বড়লোকদের বাসায় হরিণের মাথা, চামড়া এ ধরনের শোপিস দেখা যায়। এটি রিপনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। শিংগুলা দেখে একদম জীবন্ত মনে হচ্ছে। তার এখানে পশুর শুধু মাথার দাঁতসহ বিভিন্ন অংশের জিনিসপত্র পার্ট-পার্ট করে খুলে রাখা আছে।
এই উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়াই রিপন আলীর স্বপ্ন। তিনি মনে করেন, গৃহপালিত পশুর হাড় দিয়ে তৈরি এই শোপিসগুলো যদি সহজলভ্য হয়, তবে মানুষ বন থেকে বাঘ বা হরিণের মাথা ও চামড়া সংগ্রহের মতো অবৈধ কাজ বন্ধ করবে, যা বন্যপ্রাণী হত্যা রোধে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে তিনি সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে একে একটি নতুন শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat