দেশের বাজারে মুরগি, ভোজ্যতেল, চিনি, এলপিজি, সবজিসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
বাধ্য হয়ে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় কম পণ্য কিনছেন, আবার কেউ কেউ তুলনামূলক কম দামি পণ্যে ঝুঁকছেন। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ অনিশ্চয়তা ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দেশে জ্বালানিসংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মুরগি, সবজি, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
চাপে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ:
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে প্রোটিনের প্রধান উৎস মুরগির।
সোনালি ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ২৭০ থেকে ৩২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। এর প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারেও। ৮০০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে না।
বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকটে বোতলজাত ও খোলা তেল বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা এবং পাম অয়েল ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও এসব তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা ও ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ের দর ১৯৫ টাকা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।
চিনির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী:
ঈদের আগে প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর জোয়ারসাহারা বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারে ভোজ্যতেলের খুবই সংকট চলছে। চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়তি দাম দিয়ে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েল কিনে আনতে হচ্ছে।’
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং আমদানি ব্যাহত হওয়ায় আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়েছে বলে কম্পানিগুলো আমাদের জানিয়েছে। জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোজ্যতেলের বাজারে।
ভোজ্যতেল আমদানিকারক এক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক হারে ভোজ্যতেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। বিশ্ববাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়ছে।’
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার গ্যাসে। এপ্রিলে ১২ কেজি এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। যদিও বাজারে এই দরে ভোক্তারা কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ক্রেতারা বলছেন, বিক্রেতারা এখন বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার টাকার নিচে বিক্রি করছেন না। বাড়তি দর তাঁদের সংসারে চাপ তৈরি করেছে।
সবজির বাজারেও উত্তাপ : রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে সবজির দাম বেড়েই চলেছে। ঈদের আগের তুলনায় এখন প্রায় সব সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। এতে বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ।
বিক্রেতারা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বৃষ্টি ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে সবজির দাম বেড়েছে। এ ছাড়া সবজির মৌসুমও শেষ পর্যায়ে। এ কারণেও দাম বাড়তি বলে জানান তাঁরা। গতকাল রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা ও জোয়ারসাহারা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, করলা, বরবটি, ধুুন্দল ১০০ টাকা কেজি। বেশির ভাগ সবজির দাম ১০০ টাকা।
নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়লেও গত মার্চে মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটি বলেছে, মার্চে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.৭১ শতাংশ। গত রবিবার প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থাটি। ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মার্চে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ হলো পণ্যের দাম কমছে। তবে বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র।
এ ব্যাপারে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন গতকাল বলেন, ‘বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সীমিত আয়ের মানুষের জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ছে। তার ওপর সংকটের কারণে পাম্পে তেল নিতে গিয়ে অর্ধেক বেলা চলে যাচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনচালকরা ভাড়া অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর প্রভাব সরাসরি পণ্যের দামে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘পণ্যের দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হচ্ছে—সরকার বাজার তদারকিতে মনোযোগ কম দেওয়া। এই সুযোগে নানা অজুহাতে বিক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন।
ভলান্টারি কনজিউমারস ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান সজল গতকাল বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে নানা পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিশেষ করে এলপিজি গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি সহজে পাওয়াও যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে, যা ভোক্তাদের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বাজারে সোনালি মুরগির দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অতীতে এই মুরগির দাম সাধারণত ৩০০ টাকার নিচে থাকত। বর্তমানে প্রতি কেজি সোনালি মুরগির দাম ৪৫০ টাকায় পৌঁছেছে, যা ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগজনক।’
তিনি বলেন, ‘এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হলো—খামার পর্যায়ে মুরগির সরবরাহ কমে যাওয়া। কিছুদিন আগে থেকেই খামারিদের কাছে পর্যাপ্ত মুরগি নেই এবং অনেক খামারি উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে আলু ও পেঁয়াজের দাম তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।’
সূত্র: কালের কণ্ঠ
