মোঃ আব্দুর রহীম মিঞা,ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী হাট—একসময় গরু কেনাবেচার জন্য ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত ও প্রাণবন্ত গরুর হাট। হাটের দিন এলেই দূরদূরান্ত থেকে গরু নিয়ে ছুটে আসতেন ব্যবসায়ী, খামারি ও কৃষকেরা। গরুর ডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর দরদামের উত্তাপে মুখর হয়ে উঠত পুরো হাট এলাকা। গরু রাখার জায়গা পাওয়া ছিল কঠিন; কোথাও ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়া যেত না। অথচ সময়ের পরিবর্তনে সেই চেনা দৃশ্য যেন আজ স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে। গোবিন্দাসী হাট এখন অনেকটাই গরুশূন্য।
গোবিন্দাসীর হাট বসে রবি বার ও বৃহস্পতিবার সপ্তাহে দুদিন। হাট বসার আগের দিন থেকে দূর-দুরান্ত থেকে গরু আসতে শুরু করতো। আগের রাতেই সারি সারি বাঁশ বাধা তারই সাথে দুপাশে বেধে রাখা হতো গরুগুলো। গরু মানুষ একাকার হয়ে থাকতো হাট। সেই হাট এখন গরু এবং ক্রেতা শুন্য। সারি সারি বাশের খুটি শুন্য পড়ে আছে।
গোবিন্দাসী হাটের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে প্রমত্তা যমুনা নদী। অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে যমুনা নদী। একসময় নদীপথ ছিল গরু পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যমুনার বিভিন্ন চর ও দূরবর্তী এলাকা থেকে নৌকায় করে প্রচুর গরু আনা হতো এই হাটে। নদীর ঘাটে নৌকা ভেড়ার পর গরু নামানো, হাটে নিয়ে আসা এবং পছন্দের পশু কিনতে ক্রেতাদের ভিড়—সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক ব্যস্ত ও কর্মচঞ্চল পরিবেশ।
সেই সময় গরুর হাট শুধু পশু কেনাবেচার জায়গা ছিল না; এটি ছিল স্থানীয় অর্থনীতি, গ্রামীণ যোগাযোগ ও মানুষের জীবন-জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গরু পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত মাঝি, শ্রমিক, রাখাল, ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র পেশাজীবীদেরও উপার্জনের সুযোগ তৈরি হতো।
যমুনার ঢেউয়ের সঙ্গে নৌকায় ভেসে আসা গরুর বহর ছিল গোবিন্দাসী হাটের পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি। নদী আর হাটের এই সম্পর্ক স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে আজও বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
একসময় যে হাটে গরু রাখার জায়গা সংকট হয়ে দাঁড়াত, সেখানে এখন গরুর এমন স্বল্পতা কেন—এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মনে। হাটের অতীতের জমজমাট পরিবেশের সঙ্গে বর্তমান চিত্রের তুলনা করলেই পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে গরুর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কী কী কারণ কাজ করছে, তার মধ্যে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার অভাব,ক্রেতা-বিক্র্রেতার কাছ থেকে হাট ইজারার টাকা আদায়, স্থানীয় দূরব্যবহার ।
একটি হাটের গুরুত্ব শুধু সেখানে কতটি গরু বিক্রি হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু মানুষের জীবিকা, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং একটি অঞ্চলের ঐতিহাসিক পরিচয়।
গোবিন্দাসী হাটের একসময়ের গরুর সমারোহ আর যমুনা দিয়ে নৌকায় গরু আসার দৃশ্য আজ অতীতের গল্প হয়ে উঠলে তা শুধু একটি বাজারের পরিবর্তন নয়; এটি স্থানীয় ঐতিহ্যেরও পরিবর্তন।
প্রবীণদের স্মৃতিতে সেই ব্যস্ত হাট, গরুভর্তি নৌকা আর ক্রেতা-বিক্রেতার দরদামের দিনগুলো এখনো জীবন্ত। তাঁদের কাছে গোবিন্দাসী হাট মানেই ছিল গরুর বিশাল সমাগম, মানুষের ভিড় আর গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য।
গোবিন্দাসী হাটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনা শুধু চার টেবিলে নয় ,এলাকার সবত্র। হাটে গরুর সরবরাহ কেন কমেছে, ব্যবসায়ীরা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন কি না এবং পশু পরিবহনে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রয়োজন হলে স্থানীয় ব্যবসায়ী, খামারি, হাট কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পশু পরিবহন এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে হাটটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একসময় যে গোবিন্দাসী হাটে গরু রাখার জায়গা হতো না, আজ সেখানে গরুর অভাব—এই পরিবর্তন সময়ের এক নীরব বার্তা। যমুনার বুক চিরে নৌকায় গরু আসার সেই দৃশ্য হয়তো এখন আর আগের মতো নেই, কিন্তু সেই ঐতিহ্যের স্মৃতি আজও বেঁচে আছে মানুষের মনে। এলাকা বাসির প্রশ্ন একটাই—গোবিন্দাসী হাট কি ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব?
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat