দৃশ্যপট ডেস্ক রিপোর্ট
একসময় বর্ষা মৌসুম এলেই শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই শোনা যেত ছাতা মেরামতকারীদের হাঁকডাক। ভাঙা শিক, ছেঁড়া কাপড়, নষ্ট স্প্রিং কিংবা হাতল বদলে অল্প খরচে পুরোনো ছাতাকে নতুনের মতো ব্যবহারযোগ্য করে তুলতেন তারা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে শতবর্ষের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন ছাতার সহজলভ্যতা, কম আয় এবং অনিয়মিত কাজের কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে ছাতা মেরামতের পেশা।
সিরাজগঞ্জের সোনাখাড়া ইউনিয়নের রুপাখাড়া গ্রামের বাসিন্দা কোবাদ আলী প্রায় ৩৮ বছর ধরে ছাতা মেরামতের কাজ করছেন। ১৯৮৮ সালে শুরু করা এই পেশাই ছিল তার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। তবে এখন সেই পেশায় আর আগের মতো আয় নেই।
কাজের ফাঁকে কোবাদ আলী বলেন, "আগে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। বর্ষার তিন মাস ভালোভাবে কাজ করলে সারা বছরের সংসার চালানো যেত। এখন দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকাও আয় করা কঠিন হয়ে গেছে।"
তিনি জানান, তার দুই মেয়ের বিয়ে হলেও জন্মপ্রতিবন্ধী এক ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে। বর্ষা শেষে ছাতা মেরামতের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তখন সংসার চালাতে দিনমজুরের কাজ করতে হয়। ভূমিহীন এই প্রবীণ কারিগরের শেষ বয়সের একমাত্র প্রত্যাশা একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড।
হাটিকুমরুল এলাকার বাসিন্দা সোহরাব বলেন, "আগে বর্ষার দিনে গ্রামে গ্রামে ছাতা মেরামতকারীদের হাঁকডাকে পরিবেশ মুখর থাকত। এখন বাজারে কম দামে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের নতুন ছাতা সহজেই পাওয়া যায়। ফলে মানুষ পুরোনো ছাতা মেরামত না করে নতুন ছাতা কিনতেই বেশি আগ্রহী।"
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির অনেক ছাতা সহজে মেরামত করা যায় না। ফলে এই পেশার চাহিদা দ্রুত কমছে। একই সঙ্গে আয় কম ও কাজ অনিয়মিত হওয়ায় নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান খান বলেন, "ছাতা মেরামতের মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলোকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু কিছু মানুষের জীবিকা রক্ষা করা নয়; বরং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগরি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।"
ঐতিহ্যবাহী এই পেশা টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, সামাজিক সহায়তা এবং দক্ষ কারিগরদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অন্যথায় কালের পরিক্রমায় একসময় ছাতা মেরামতের এই শতবর্ষের পেশাটি শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat