আধুনিক যানবাহনের দাপটে বিলুপ্তির পথে শতবর্ষের ঐতিহ্য ঘোড়ার গাড়ি
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
এক সময় রায়গঞ্জের গ্রামীণ জনপদের সকাল-বিকেল মুখর থাকত ঘোড়ার গাড়ির টুংটাং শব্দে। গ্রামের কাঁচা-পাকা সড়ক, হাট-বাজারের পথ কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই ঘোড়ার গাড়ি ছিল মানুষের অন্যতম ভরসার বাহন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যানবাহনের বিস্তার এবং ঘোড়া পালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে আজ সেই ঐতিহ্যবাহী বাহন হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময়ের পরিচিত দৃশ্য এখন কেবল প্রবীণদের স্মৃতি আর ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও জনপদে ঘোড়ার গাড়ির ব্যাপক চলাচল ছিল। কৃষিপণ্য পরিবহন, হাট-বাজারে যাতায়াত, বিয়ে-শাদি ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এই বাহনের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেক পরিবার ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছিল।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, তখনকার সময়ে ঘোড়ার গাড়ি ছিল গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ফসল পরিবহন ও মানুষের চলাচলে এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ঘোড়ার গাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র পেশাজীবী শ্রেণি, যারা দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, মোটরসাইকেল, ট্রাক্টর ও অন্যান্য ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। দ্রুতগতি, সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম সময় ব্যয়ের কারণে মানুষ আধুনিক বাহনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে কমে যায় ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা ও ব্যবহার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হাতে গোনা কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া আর তেমন দেখা যায় না এক সময়ের জনপ্রিয় এই বাহন। অনেক মালিকই ঘোড়া বিক্রি করে দিয়েছেন কিংবা পেশা পরিবর্তন করেছেন। যারা এখনও এ পেশার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন, তারাও নানা সংকটের মুখোমুখি।
ঘোড়ার গাড়ির কয়েকজন মালিক জানান, বর্তমানে ঘোড়া পালন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। পর্যাপ্ত চারণভূমির অভাব, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয় এবং আয় কমে যাওয়ার কারণে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মও আর ঘোড়ার গাড়ির পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, ঘোড়ার গাড়ি শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়; এটি গ্রামবাংলার জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুগের পরিবর্তনে এর ব্যবহার কমে গেলেও ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে এর গুরুত্ব আজও অম্লান। তাই বিলুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রায়গঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইলিয়াস হাসান শেখ বলেন, “ঘোড়ার গাড়ি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের পরিবর্তনে এর ব্যবহার কমে গেলেও এটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে রয়ে গেছে। এ ধরনের ঐতিহ্য সংরক্ষণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।”
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক ঘোড়ার গাড়ি আজ হয়তো বাস্তবতার চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস এখনও মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব নুরুল হক নয়ন
✆ ০৯৬৩৮-৯০৭৬৩৬। ই মেইল: thedailydrishyapat@gmail.com
।
Copyright 2025 Pratidinerdrishyapat